তালেবানের ইতিহাস ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে আছে আফগানিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসের সাথে। দেশটিতে বহু বছর ধরে দাপট চলছে এই সশস্ত্র সংগঠনের। ২০২১ সাথে মার্কিন বাহিনীকে হটিতে তারা আবার দেশটির ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। চলুন জেনে আসি তালেবানের ইতিহাস সম্পর্কে, তালেবান অর্থ কি এবং তালেবান সম্পর্কে আরো অনেক তথ্য
আফগানিস্তান ও তালেবান
আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত আগ্রাসন শেষ হওয়ার পর মুজাহিদিন আমলের গৃহযুদ্ধের মাঝেই তালেবানের জন্ম। নাজিবুল্লাহ সরকারের পতনের পর কান্দাহারের স্থানীয় কিছু আলেম যেমন- মোল্লা মোহাম্মাদ ওমর, মোহাম্মাদ ঘৌস, হাসান আখুন্দ, মোহাম্মাদ রব্বানি চলমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ নিয়ে নিজেদের মাঝে আলোচনা শুরু করেন। তারা সবাই ছিলো সোভিয়েত বিরোধী যুদ্ধে সহযোদ্ধা এবং সবার বাড়িই ছিলো উরুগান প্রদেশে।
তারা কয়েকটি বিষয়ে একমত হন, যার মধ্যে ছিলো- দেশে স্থিতিশীলতা আনা, জনগনের হাত থেকে অস্ত্র ফিরিয়ে নেয়া, ইসলামিক শাসন ব্যবস্থা চালু করা এবং ইসলামপন্থীদের আফগানিস্তানের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা।
তালেবান অর্থ কি
যেহেতু তারা সবাই মাদরাসার ছাত্র ছিলেন তাই সংগঠনের নাম হিসেবে তালিব বা তালেবান শব্দটি গৃহীত হয়। শব্দটির অর্থ ছাত্র। এই নামের কারণে তারা এই সুবিধা পেয়েছিল যে, শুরুতে অনেকেই বুঝতে পারেনি এই সংগঠন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে গঠিত হয়েছে।
১৯৯৪ এর গ্রীষ্মে কান্দাহারের কাছে সংগঠনটি গঠিত হয়। মোল্লা ওমর ছিলো প্রধান উদ্যোক্তা। ১৯৯২ সাল থেকে কান্দাহারের উত্তরাঞ্চলীয় মাইওয়ান্দ এলাকার সাং-ই হিসার নামের একটি মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন তিনি। তখন মোল্লা ওমরের বয়স ছিলো ৩২-৩৪ বছরের আশপাশে। ৫০ জন মাদরাসা ছাত্রকে নিয়ে যাত্রা শুরু করে তালেবান। তবে এক মাসের মধ্যে এই সংখ্যা ১৫ হাজারে পৌছায়।
এর মধ্যে পাকিস্তানে উদ্বাস্তু হয়ে যাওয়া অনেক আফগান ও পাকিস্তানের সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন মাদরাসায় পড়তে যাওয়া আফগান ছাত্ররাও যোগ দেয় সংগঠনটিতে। প্রাথমিক পর্যায়ে স্থানীয় কিছু ব্যবসায়ী তাদের আড়াই লাখ ডলারের মতো অর্থ সহায়তা দেয় বলে জানা যায়।
দ্রুতই স্থানীয় পশতুন জাতিগোষ্ঠির নেতাদের কাছ থেকে সমর্থন লাভ করে তালেবান। প্রথম দিকের সদস্যরাও প্রায় সবাই ছিলো জাতিগত পশতুন। বিশষ করে দুররানী পশতুনরা এটিকে জোরালো সমর্থন দেয়। এরপর ক্রমে তাকিজ ও উজবেকরাও জড়িত হয় তালেবানের সাথে।
সশস্ত্র সংগ্রামের শুরুতেই তালেবান মুখোমুখি দাড়ায় কান্দাহারের ওয়ারলর্ড বা যুদ্ধবাজ নেতাদের। মুজাহিদিন গ্রুপের অনেকেই সন্ত্রাসী কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়ে। দুর্নীতি, নৃসংসতা ও অব্যাহত গৃহযুদ্ধ থেকে তালেবান দেশকে পরিত্রাণ দিতে লড়াইয়ে নামে। বিশেষ কান্দাহারে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে একটি পরিবারের সদস্যদের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা তালেবানকে এই লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করে।
তালেবান সরকার
তাই শুরুতে তারা স্থানীয়ভাবে এসব সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নিতে শুরু করে। সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার কারণে সাধারন মানুষ তালেবানকে পছন্দ করতে শুরু করে। তালেবানের এলাকাগুলোতে সন্ত্রাস, দুর্নীতি কমে আসায় তালেবানের প্রতি তাদের সমর্থন ক্রমেই জোরালো হয়।
কিছুদিনের মধ্যে পাকিস্তানের উদ্বাস্তু ক্যাম্পগুলোর ২০ হাজার মাদরাসা ছাত্র তালেবানে যোগ দিতে দেশে ফেরে, যাদের বেশির ভাগেই বয়স ছিলো ১৪ থেকে ২৫ এর মধ্যে। পাকিস্তান তালেবানদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে শুরু করে। আফগানিস্তানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পাকিস্তানের জন্য খুব জরুরি একটি বিষয়।
যে কারণে এর আগেও তারা গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ার কিংবা অন্য মুজাহিদিন গ্রুপগুলোকে কাবুলের ক্ষমতা দখলে সহযোগিতা দিয়েছে। কিন্তু আগের সেসব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় এবার তারা তালেবানকে সহযোগিতা দিতে শুরু করে। এক্ষেত্রে পাকিস্তােেনর গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই বড় ভুমিকা রেখেছে।
ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে ওঠা তালেবান ১৯৯৪ সালের নভেম্বরে মাইওয়ান্দ থেকে কান্দাহার অভিমুখে আকস্মিক অভিযান শুরু করে। কান্দাহার ও আশপাশের এলাকার ওপর দিয়ে পাকিস্তান থেকে সড়ক পথে পণ্য যেত ইরান ও মধ্য এশিয়ায়। কিন্তু সন্ত্রসী তৎপরতার কারণে পাকিস্তান চেয়েছিলো ওই এলাকাটিতে স্থিতিশীলতা আনতে।
তালেবানের ইতিহাস ও রাজনৈতিক উত্থান
এজন্য তালেবানের প্রথম ওই বড় সামরিক অভিযানে পাকিস্তান সহযোগিতা করেছিল বলেও জানা যায়। নভেম্বরে কান্দাহার নগরী ও এর আশপাশের এলাকা তালেবানের দখলে যায়। ওই সময় তারা সেখানে থাকা ৬টি মিগ-২৯ ফাইটার ও চারটি এমআই-১৭ অ্যাটাক হেলিকপ্টার জব্দ করে।
১৯৯৫ সালের ৪ জানুয়ারির মধ্যে ১২টি প্রদেশ তালেবানের নিয়ন্ত্রণে আসে। ওই বছর ডিসেম্বরের মধ্যে তালেবান নিয়ন্ত্রিত প্রদেশের সংখ্যা দাড়ায় ৩৪-এ। কিছুদিন পর কান্দাহারে পশতুন নেতাদের বিশাল এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ইসলামিক আমিরাত অব আফগানিস্তানের ঘোষণা দেয়া হয় এবং মোল্লা ওমরকে এর নেতা হিসেবে আমিরুল মোমেনিন উপাধি দেয়া হয়। তখন কাবুলের নিয়ন্ত্রন ছিলো আহমদ শাহ মাসুদের বাহিনীর কাছে। ওই সমাবেশ থেকে এদের বিরুদ্ধে ‘জিহাদ’ ঘোষণা করে তালেবান। ১৯৯৬ এর আগস্টে জালালাবাদ দখল করে তারা। এরপর তারা শুরু করে কাবুল অভিযান।
ওই বছরই ২৬ সেপ্টেম্বর আহমদ শাহ মাসুদের বাহিনী কাবুল ছেড়ে পানশির উপত্যকায় চলে যায়। যার ফলে পরদিন তালেবানের কাবুল দখল সহজ হয়। দ্রুত সব সরকারি দফতরের নিয়ন্ত্রণ নেয় তালেবান যোদ্ধারা। আর আহমদ শাহ মাসুদ উত্তরাঞ্চলীয় মিলিশিয়াদের নিয়ে গঠন করেন নর্দান এলায়েন্স। তার সংগঠনের কেন্দ্র হয় পানশির উপত্যকা।
তালেবানরা সাবেক প্রেসিডেন্ট ও কমিউনিস্ট নেতা মোহাম্মাদ নাজিবুল্লাহ ও তার ভাইকে হত্যা করে প্রকাশ্যে লাশ ঝুলিয়ে রাখে। দ্রুত সরকার গঠন করে তারা। কাবুল থেকেই চলতে থাকে ইসলামিক আমিরাতের কার্যক্রম। কঠোর শরিয়া আইন চালু করা হয় আফগানিস্তানে। ১৯৯৮ সালের মধ্যে আফগানিস্তানের ৯৮ শতাংশ এলাকা তালেবান শাসনের অধীনে আসে।
মোল্লা ওমর
তালেবানের ইতিহাস আর মোল্লা ওমর অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত বিশাল এই গোষ্ঠিটির প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা মোহাম্মাদ ওমর। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে তালেবান ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর যিনি আত্মগোপনে চলে যান। মোল্লা ওমরকে খুঁজে পেতে যুক্তরাষ্ট্র কোন চেষ্টাই বাদ রাখেনি; কিন্তু তার অবস্থান এতটাই গোপনীয় ছিলো যে, মৃত্যুর খবরটিও কেউ জানতে পারেনি। আত্মগোপনে থাকা অবস্থায়ই মোল্লা ওমরের মৃত্যু হয় ২০১৩ সালে। দুই বছর পর ২০১৫ তার ছেলে সেই তথ্য প্রকাশ করার আগে সারা দুনিয়া অন্ধকারেই ছিলো এই তালেবান নেতা সম্পর্কে।
প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা ওমরের মৃত্যুর পরও তালেবানের তৎপরতা থামেনি। অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে গ্রুপটি তাদের সদস্যদের সংগঠিত রেখেছে। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাওয়া শুরু করতেই তারা আবার বিভিন্ন এলাকা দখলে অভিযান শুরু করে এবং ইতোমধ্যেই আফগানিস্তানের বেশির ভাগ অঞ্চল তাদের দখলে চলে গেছে।
তালেবান বর্তমান প্রধান
বর্তমানে তালেবানের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন হাইবাতুল্লাহ আখুনজাদা। ইসলামিক আইনবিষয়ক একজন স্কলার আখুনজাদা। তালেবানের সর্বোচ্চ ব্যক্তি তিনি। সংগঠনটির রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামরিক বিষয়ে নীতি নির্ধারণী ক্ষমতা এই নেতার। ২০১৬ সালে তালেবানের তৎকালীন নেতা আখতার মনসুর যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় নিহত হওয়ার পর আখুনজাদা তালেবানের দায়িত্ব নেন।

ওই বছর মে মাসে তালেবান প্রধান হওয়ার পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। এর আগে দীর্ঘ ১৫ বছর পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় কুচলাক শহরের একটি মসজিদ সংলগ্ন মাদ্রাসায় পড়াতেন তিনি। এর আড়ালে গোপনে তালেবানের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করেছেন। পরবর্তীতে সেখানে তার ছাত্র ও সহযোগীরা এ তথ্য জানিয়েছেন বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে।
উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে, আখুনজাদা ১৯৬১ সালে আফগানিস্তানের কান্দাহার প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন। পশতুন জাতির নুরজাই গোত্রের একটি পরিবারে জন্ম তার। তার বাবা মোল্লা মোহাম্মাদ আকন্দ ছিলেন একজন আলেম। স্থানীয় মসজিদে ইমামতিও করতেন তিনি। পারিবারিকভাবে ধর্মীয় শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হন তিনি। আফগানিস্তানের সোভিয়েত দখলদারিত্বের সময় আরো অনেক পরিবারের মতো আখুনজাদার পরিবারও পাকিস্তানের কোয়েটায় উদ্বাস্তু হিসেবে আশ্রয় নেয়।
১৯৯৬ সালে তালেবান আফগানিস্তানের শাসন ক্ষমতা দখল করার পর আখুনজাদা প্রথমে ফারাহ প্রদেশে একটি আধাসামরিক বাহিনীতে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে মোল্লা ওমর তাকে কান্দাহারে ১ লাখ শিক্ষার্থীর একটি মাদ্রাসার দায়িত্বে নিয়োজিত করেন। যোদ্ধা হিসেবে যতটা খ্যাতি তার চেয়ে আখুনজাদা একজন স্কলার হিসেবে বেশি পরিচিত ছিলেন আফগানিস্তানে। যে কারণে কিছুদিন পর তাকে শরীয়া আদালতের প্রধান বিচারক নিযুক্ত করা হয়। মোল্লা ওমর ফতোয়া বিষয়ক যে কোন ইস্যুতে তার পরামর্শ নিতেন বলে জানা যায়। টপিক : তালেবান অর্থ কি
তালেবানের আজকের খবর
আখুনজাদার অবস্থান নিয়ে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। কেউ কেউ বলেন, মার্কিন সামরিক অভিযানের পরও তিনি আফগানিস্তানেই লুকিয়ে ছিলেন। আবার কেউ বলেন, তিনি পাকিস্তানের আফগান সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় ছিলেন। হাইবাতুল্লাহ আখুনজাদার বর্তমান বয়স ৬০ বছরের আশপাশে বলে ধারণা করা হয়।
সর্বশেষ ২০২১ সালের আগস্টে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর তিনি কান্দাহারেই বসবাস করতে থাকেন। খুব কমই তিনি প্রকাশ্যে আসেন। বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কোন উপলক্ষ থাকলেই কেবন তিনি প্রকাশ্যে আসেন। তবে তার কাছ থেকেই সব দিক নির্দেশনা আসে।
তালেবান ক্ষমতায় আসার পর আফগানিস্তানকে ইসলামিক আমিরাত ঘোষণা করা হয়েছে। এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন হাইবাতুল্লাহ আখুনজাদা।
আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন : আহমেদ স্টোর
তথ্যসূত্র :
আফগানিস্তানে পটপরিবর্তন : ভূরাজনৈতিক প্রভাব, লেখক : আলফাজ আনাম


