চীন : মহাপ্রাচীরের দেশ

মহাপ্রাচীরের দেশ চীন। সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার এই দেশটি আয়তনেও বিশাল। সামরিক ও অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীন বিশ্বরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ এক খেলোয়াড়। প্রধানত পাহাড়ি জনপদের এই দেশটিতে আছে সৌন্দর্য আর ইতিহাস ঐতিহ্যের বিশাল সমাহার। সব কিছু মিলে চীন দেশটি কেমন সেটাই জানাবো এই লেখায়-

দেশ : চীন
রাজধানী : বেইজিং
প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা : ১ জানুয়ারি, ১৯১২
আয়তন : ৯৫ লাখ ৯৬ হাজার ৯৬১ বর্গ কিলোমিটার
জনসংখ্য : ১৪০ কোটি ৫০ হাজার
জাতীয়তা : চাইনিজ
অফিশিয়াল ভাষা : মান্দারিন
মুদ্রা : রেনমিনবি
ধর্ম : ৭৩ শতাংশ ধর্মহীন, ১৬ শতাংশ বৌদ্ধ, ২.৫ শতাংশ খ্রিস্টান ও দশমিক ৪৫ শতাংশ ইসলাম
সরকার ব্যবস্থা : এক দলীয় সমাজতন্ত্র
পার্লামেন্ট : ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেস
প্রদেশ : ২২টি
বিশেষ অঞ্চল : ৫টি
শিক্ষিতের হার : ৯৬ শতাংশ

চীনের জনসংখ্যা ও অবস্থান

পূর্ব এশিয়ার এক বিশাল ভূখণ্ড চীন। আয়তনে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম দেশটি জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের এক নম্বর। বিশাল এই দেশটির সাথে আছে ১৪টি দেশের সীমান্ত যা বিশ্বে আর কোন দেশের নেই। চীনের উত্তরে মঙ্গোলিয়া; উত্তর পূর্বে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া; পূর্বে চীন সাগর; দক্ষিণে ভিয়েতনাম, লাওস, মিয়ানমার, ভারত, ভূটান, নেপাল; দক্ষিণ পশ্চিমে পাকিস্তান; পশ্চিমে আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান, কিরগিজিস্তান ও কাজাখস্তান। এছাড়া চীনের পূর্বে পীত সাগরের পাশে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান; দক্ষিণ চীন সাগরের উল্টো দিকে আছে ফিলিপাইন। আর দেশটির মোট জনসংখ্যা ১৪০ কোটির কিছু বেশি।

মহাপ্রাচীর, চীন

চীন কোন ধরনের রাষ্ট্র

আদি প্রাচীনকাল থেকেই চীনে মানব বসতি ছিল বলে প্রমাণিত হয়েছে। মধ্যযুগে স্থানীয় রাজবংশগুলোর শাসন ছিলো দেশটিতে। আধুনিক প্রজাতন্ত্র গঠিত হয়েছে ১৯১১ সালের চাইনিজ রেভ্যুলেশনের মাধ্যমে। আর ১৯৪৯ সালে সালের ১ অক্টোবর কমিউনিস্ট নেতা মাও সে তুংয়ের নেতৃত্বে দেশটির ক্ষমতা দখল করে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি। প্রতিষ্ঠিত হয় পিপলস রিপাবলিক অব চায়না।

সেই থেকে কমিউনিস্ট পার্টির একদলীয় শাসনই চলছে চীনে। কমিউনিস্ট শাসনে দেশটি উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে গেলেও চীনের জনগনের রাজনৈতিক স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকারসহ অনেক অধিকার সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। একটি পার্লামেন্ট থাকলেও মূলত কমিউনিস্ট পার্টির নেতারাই দেশটির নীতি নির্ধারণী ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিপতি।

চীনা পার্লামেন্ট ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের সদস্য সংখ্যা ২ হাজার ৯৮০জন, যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় পার্লামেন্টারি বডি। তবে এই বিশাল সংখ্যক এমপিরা পার্টটাইমার হিসেবেই পরিচিত। কারণ বছরে একবার দুই সপ্তাহের জন্য বসে অধিবেশন। পার্লামেন্টের আবার ১৭০ সদস্যের একটি স্ট্যান্ডিং কমিটি আছে, তারাই মূল কাজটি করে। নিয়মিত অধিবেশনও হয় এই কমিটির। সদস্যদের সবাই কমিউনিস্ট পার্টির মনোনীত।

সমালোচকরা অবশ্য চীনা পার্লামেন্টকে অলঙ্কারিক হিসেবেই অভিহীত করে থাকেন, কারণ ১৯৮৬ সালের পর এই পার্লামেন্ট আজ পর্যন্ত সরকারের কোন বিলের বিরুদ্ধে ভোট দেয়নি।

আরো পড়ুন :

আর্জেন্টিনা ফুটবলের দেশ, সৌন্দর্যের দেশ

বরফের দেশ কানাডা

আজারবাইজান : আগুনের দেশ

চীনের বিভিন্ন অঞ্চল

মোট ২২টি প্রদেশ আছে চীনে। এছাড়া আছে ৪টি স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল- ইনার মঙ্গোলিয়া, জিনজিয়াং, গুয়াংজি, নিংজিয়া ও তিব্বত। এছাড়া আছে দুটি বিশেষ শাসিত অঞ্চল- হংকং ও ম্যাকাও। আর চীনের মূল ভূখণ্ডের বাইরে চীন সাগরের দ্বীপরাষ্ট্র তাইওয়ানকেও নিজের অংশ মনে করে বেইজিংয়ের সরকার। যদিও তাইওয়ানের অনেক বিষয় চীনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। দেশটিতে স্বাধীনতাপন্থীদের জোরালো অবস্থান আছে। পশ্চিমা কিছু দেশ তাইওয়ানকে স্বীকৃতিও দিয়েছে।

টেরাকোটা আর্মি, চীন

কমিউনিস্ট শাসনে চীনের অভ্যন্তরীণ জীবনযাত্রা যতই নিয়ন্ত্রিত হোক, দেশটি এই সময়ে সমৃদ্ধি অর্জন করেছে অর্থনীতি ও সামরিক শক্তিতে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় সেনাবাহিনী চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি। সামরিক শক্তি বিষয়ক ওয়েবসাইট গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ারের তথ্য অনুযায়ী যার সক্রিয় সদস্য সংখ্যা ২১ লাখ ৮৩ হাজার। সামরিক শক্তিতে চীন এখন বিশ্বে সুপার পাওয়ার হিসেবে স্বীকৃত। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সাথে পাল্লা দিয়ে দেশটি তার অস্ত্রের ভাণ্ডারে প্রতিনিয়ত যুক্ত করছে নতুন নতুন অস্ত্র।

চীনের অর্থনীতি

আর অর্থনীতিতে চীনের উত্থান মূলত শুরু হয়েছে ১৯৭৮ সালের অর্থনৈতিক সংস্কার পদক্ষেপের পর থেকে। এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় রফতানিকারক দেশ চীন। ওই সংস্কারের মূল পদক্ষেপ ছিলো বেসরকারি উদ্যোগে ব্যবসায় গঠনের অনুমতি। কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতা দখলের পর চীনে সব প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রায়ত্ব করা হয়েছিল, সেই নীতির বাইরে গিয়ে এই পদক্ষেপ দেশটির অর্থনীতিকে পাল্টে দিতে শুরু করে।

এই প্রতিবেদনের ভিডিও দেখুন

পাশাপাশি বিশাল জনগোষ্ঠিকে পরিণত করা হয় মানব সম্পদে। যার ফল চীন দ্রুত পেতে শুরু করে। ব্যাপক হারে শুরু হয় ব্যবসায় বিনিয়োগ। দ্রুত উন্নত দেশের কাতারে চলে যায় চীন। পঞ্চাশ বছর আগের ও আজকের চীন তাই মুদ্রার ভিন্ন দুই পিঠ। এখন চীনের সমৃদ্ধ নগরীর অভাব নেই। দৃষ্টিনন্দন আর আকাশচুম্বি সব স্থাপনা, সেই সাথে দেশটির ইতিহাস ঐতিহ্য তো আছেই।

নিষিদ্ধ নগরী, চীন

চীনের মহাপ্রাচীর

ঐতিহ্যের কথা এলে অবশ্য সবার আগে মনে পড়বে চীনের মহাপ্রাচীরের কথা। চীন মানেই আমাদের অনেকের কাছেই মহাপ্রাচীরের দেশ। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ প্রাচীর ও দীর্ঘ স্থাপনা। এই মহাপ্রাচীর চীনের পশ্চিম সীমানা থেকে শুরু করে পূর্ব উপকূল পর্যন্ত প্রায় ৬০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত।

আক্রমণকারীদের দূরে রাখা এবং অনুপ্রবেশকারীদের আটকানোর জন্য চীনা সম্রাটরা এই প্রাচীর নির্মাণ করেন খ্রিস্টপূর্ব ৭ম শতাব্দীতে। পরবর্তীতে বিভিন্ন যুগের শাসকরা এটির আকারে বৃদ্ধি করেছেন। দুর্গম পাহাড়ের ওপর এত বিশাল প্রাচীর নির্মাণ সত্যিই বিস্ময়কর। দেয়ালের গড় উচ্চতা ৬ থেকে ৮ মিটার। পাশাপাশি পাঁচটি ঘোড়া ছুটতে পারে এর ওপর দিয়ে। প্রাচীরের বিভিন্ন স্থানে আছে ওয়াচ টাওয়ার ও ছোট ছোট দুর্গ।

মহাপ্রাচীর দেখার জন্য পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় স্পট রাজধানী বেইজিংয়ের বাদালিং পাস। বেশ কয়েকটি প্রদেশের ওপর দিয়ে এই প্রাচীর চলে গেলেও বেইজিংয়ের পাশ্বর্তী স্থানগুলোতেই বেশি ভীড় দর্শনার্থীদের। গুবেইকুই ও মুতিয়ানো নামের দুটি স্পটও আছে বেইজিংয়ের কাছাকাছি।

চীনের এই মহাপ্রাচীর বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের একটি এবং ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। চীন ভ্রমণে যাওয়া পর্যটকদের কাছে দর্শণীয় স্থানের মধ্যে পছন্দের তালিকায় সবার আগেই থাকে এই মহাপ্রাচীর।

চীনের পর্যটন

রাজধানী বেইজিং এর নিষিদ্ধ নগরী দর্শণার্থীদের কাছে আরেক বিস্ময়। ইউয়ান রাজবংশের সময়ে নির্মিত নগরীতে পরবর্তীতে বাস করেছেন আরো অনেক রাজা। বিশেষ করে মিং ও কুইং রাজবংশের ২৪ জন শাসক বাস করতেন এখানে। সে সময় সাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিলো বলে এটিকে নিষিদ্ধ নগরীও বলা হয়। ১০ মিটার উচু দেয়াল ঘেরা ৭ লাখ ২০ হাজার বর্গমিটারের স্থানটিতে শাসকদের বাসভবন ছাড়াও প্রশাসনিক অনেক দফতর ছিলো। সব মিলে এখানে আছে ৯৮০টি ভবন। ৫০০ বছর এটি ছিলো চীন সম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দু। যা সবটা ঘুরে দেখতে লাগবে কয়েক ঘণ্টা।

এর কাছেই আছে বেইজিংয়ের বিখ্যাত তিয়ানআনমেন স্কয়ার। বেইজিংয়ের জিরোপয়েন্ট হিসেবে খ্যাত এই স্কয়ারে আছে মনুমেন্ট অব পিপলস হিরোস নামের স্মৃতিস্তম্ভ, গ্রেট হল, ন্যাশনাল মিউজিয়াম ও মাও সেতুং মেমোরিয়াল হল।

সাংহাই নগরী চীন

দ্যা টেরাকোটা আর্মি চীনের আরেকটি ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান। প্রত্নতাত্ত্বিক এই নিদর্শনটি সাংহাই প্রদেশের সিয়ান শহরে অবস্থিত চীনের প্রথম সম্রাট কিন শি হুয়াং এর সমাধি ক্ষেত্রে। সম্রাট কিন শি হুয়াং এর মৃত্যুর পর সম্রাটের সম্মানার্থে পোড়ামাটি দিয়ে এই সৈন্যবাহিনী তৈরি করা হয়েছিল বলে কথিত আছে। প্রায় ২০০ বছর ভূগর্ভস্থ ছিল এই টেরাকোটা আর্মি। ১৯৭৪ সালে এটির খোজ পাওয়া যায়।

এখানে অবিকল মানুষের আকার ও আকৃতির ৮০০০ সৈন্য মূর্তি আছে। আছে ৫২টি ঘোড়া, ১০০ টির মত রথ এবং বেশকিছু বেসামরিক লোকজন। দেখলে মনে হয় বিশাল এক সেনাবাহিনী কুচাকওয়াজের জন্য দাড়িয়েছে। এই মূর্তিগুলোর একটির সাথে অন্যটির চেহারার কোন মিল নেই। ২০০০ বছর আগের এই নির্মাণ দক্ষতা দেখে বিস্মিত না হয়ে উপায় থাকে না।

আরো পড়ুন :

ছবির মতো দেশ অস্ট্রেলিয়া

ফুটবল আমাজন আর ঐতিহ্যের দেশ ব্রাজিল

পান্ডা ব্রিডিং সেন্টার

চীন ভ্রমণকারীদের কাছে সিচুয়ান প্রদেশের চেংডু শহরের রিসার্জ বেজ অব জায়ান্টা পান্ডা ব্রিডিং সেন্টার আরেক আকর্ষণের নাম। পান্ডাদের দেখতে হাজির হয় প্রতিদিন অনেক দর্শনার্থী। ১৯৮৭ সালে মাত্র ৬টি পাণ্ডা নিয়ে এই রিসার্চ সেন্টার তার যাত্রা শুরু করেছিল। এখানে আপনি ভলান্টিয়ার প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করে এদের জীবনধারণ ও বংশবিস্তার সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারবেন।

গুয়াংজি প্রদেশের গুইলিং শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া স্বচ্চ পানির লি নদী আকর্ষণের আরেক নাম। পাহাড়ের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা এই নদীতে বোট কিংবা বাশের ভেলায় চড়ে বেড়ানোর আনন্দ আর কোথাও খুজে পাওয়া যাবে না। বলা হয়, চমৎকার প্রাকৃতিক দৃশ্যের জায়গাটি থেকেই নাকি চীনের চিত্রশিল্পী ও কবিরা তাদের শিল্পকর্মের প্রেরণা পেয়ে থাকেন। মাওর পর্বতমালা থেকে নেমে আসা এই নদীটির ৮৩ কিলোমিটার লম্বা। নদী তীরের পাবর্ত্য জনপদগুলোও সুন্দরের আরেক ভাণ্ডার।

চীনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখে শেষ করা যাবে না। তিব্বতের পোটালা প্যালেস, সুজহউয়ের ক্লাসিক্যাল গার্ডেন, সাংহাইয়ের হলুদ পাহাড় কিংবা বেইজিংয়ের পাশ্ববর্তী সামার প্যালেস দেখে আসতে পারেন।

আর আলোঝলমল চকচকে নগরী দেখতে হলে যেতে পারেন হংকং, ম্যাকাও কিংবা সাংহাইয়ে। আধুনিক বিশ্বের সব কিছু এখানে পাবেন এক সাথে। হংকং বা ম্যাকাওয়ে আপনি পাবেন পুরো পশ্চিমা দুনিয়ার ফ্লেভার। হংকং পিক ট্রামে চড়ে ভিক্টোরিয়া পিকে না উঠলে নাকি ভ্রমণটাই বৃথা!

হংকংয়ের সৈকত, ক্যাসিনো, রেস্ট্রুরেন্ট কিংবা পার্কগুলোতে মানুষের ভীড় লেগেই থাকে। ভিক্টোরিয়া হারবারে ফেরিতে ঘুড়ে বেড়াতে দর্শণার্থীরা লাইন ধরে অপেক্ষা করে। এছাড়া হংকং ডিজনিল্যান্ড, বুদ্ধ মূর্তি, ওয়াং তাই সিন টেম্পলও পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়।

আমাদের ফেসবুক পেজটিতে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন : আহমেদ স্টোর

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top