ন্যাটো কি

ন্যাটোর সর্বশেষ সদস্য রাষ্ট্র কোনটি

নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন (The North Atlantic Treaty Organization – NATO)- সংক্ষেপে ন্যাটো। বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক জোট ন্যাটো। নর্থ আটলান্টিক অ্যালায়েন্স নামেও ডাকা হয় এই জোটকে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা মহাদেশের ৩০টি দেশের সামরিক এই জোট মূলত দেশগুলোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্যই গঠিত হয়েছে। কিভাবে গঠিত হয়েছিল ন্যাটো, ন্যাটোর সদস্য দেশ কয়টি , ন্যাটো কোন ধরণের জোট , ন্যাটোর সর্বশেষ সদস্য রাষ্ট্র কোনটি – সেসব নিয়ে আলোচনা করবো।

ন্যাটো কত সালে প্রতিষ্ঠিত হয়

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় ফ্রান্স ও ব্রিটেন একটি সামরিক সহযোগিতা চুক্তি করে। ফ্রান্সের উত্তরাঞ্চলীয় শহর ডুনক্রিকে স্বাক্ষরিত ওই চুক্তিটি ট্রিটি অব ডুনক্রিক নামে পরিচিত। পরের বছর এই জোটে যোগ দেয় আরো তিনটি দেশ- বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ড ও লুক্সেমবুর্গ যারা এক সাথে বেনেলুক্স নামে পরিচিত।

ব্রাসেলসে এই দেশ পাচটির মাঝে একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়, যার নাম দেয়া হয় ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন। একই সময় উত্তর আমেরিকার দেশগুলোকেও যুক্ত করে বড় আকারের একটি সামরিক জোট গঠনের আলোচনা শুরু হয় এই দেশগুলোর মাঝে। যার ফলস্বরূপ ১৯৪৯ সালের ৪ এপ্রিল একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি সাক্ষরিত হয়- যার নাম নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি বা উত্তর আটলান্টিক চুক্তি। ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের দেশগুলোর সাথে নতুন এই চুক্তিতে যোগ দেয় উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের কিছু দেশ। দেশগুলো ছিলো যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, পর্তুগাল, ইতালি, নরওয়ে, ডেনমার্ক ও আইসল্যান্ড।

এভাবেই জন্ম হয় ন্যাটোর।

ন্যাটো কি

তবে কোরীয় যুদ্ধের আগ পর্যন্ত এই জোট মূলত ছিলো শুধুই আনুষ্ঠানিকতা। ওই যুদ্ধের সময় সমন্বিত সামরিক কাঠামো দাড় করানো হয় ন্যাটোতে। ১৯৫১ সালে স্থাপন করা হয় ন্যাটোর অপারেশন কমান্ড সেন্টার। পরের বছর বেসামরিক কর্মকর্তা হিসেবে সেক্রেটারি জেনারেলের পদ সৃষ্টি করা হয়। ওই বছর ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর সেনাদের নিয়ে বিশাল এক মহড়া আয়োজন করা হয়। একই বছর ন্যাটো জোটে যোগ দেয় গ্রিস ও তুরস্ক।

ন্যাটো কি
ন্যাটো সদর দফতর ব্রাসেলসে (টপিক : ন্যাটোর সর্বশেষ সদস্য রাষ্ট্র )

আশির দশকের শুরুতে গণতন্ত্র চর্চা শুরু হওয়ার পর স্পেন যোগ দেয় ন্যাটোতে। ১৯৯০ এর দশকে এসে ন্যাটো সামরিক জোটের গণ্ডি ছাড়িয়ে রাজনৈতিক ও মানবিক বিষয়ে নিজের কর্মকাণ্ড প্রসারিত করে। এবং নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বাইরেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভিন্ন সামরিক অভিযানে অংশ নিতে শুরু করে।

 

ন্যাটোর সদস্য দেশ কয়টি কি কি NATO Countries

বর্তমানে ন্যাটোর সদস্য সংখ্যা ৩১।

প্রতিষ্ঠাকালীন ১২টি দেশ ছাড়াও পরবর্তীতে ৮ দফায় বাকি দেশগুলোকে এই জোটে নেয়া হয়। জোটের সর্বশেষ সদস্য হিসেবে যোগ দিয়েছে ফিনল্যান্ড। সুইডেনের সদস্য পদ প্রক্রিয়াধীন। আয়ারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, সুইডেন, সুইজারল্যান্ডের মতো ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দেশ এর সদস্য নয়।

ন্যাটোর মুসলিম সদস্য দেশ কয়টি

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোটে রয়েছে একাধিক মুসলিম সদস্য দেশ। এর মধ্যে তুরস্ক উল্লেখযোগ্য। ন্যাটো জোটে যুক্তরাষ্ট্রের পরই সবচেয়ে বড় সামরিক বাহিনী রয়েছে তুরস্কের। ইউরোপ ও মুসলিম বিশ্বের প্রভাবশালী এই দেশটি ১৯৫২ সালে ন্যাটোর সদস্য পদ লাভ করে।

ন্যাটো জোটের আরেকটি মুসলিম প্রধান দেশের নাম আলবেনিয়া। দক্ষিণপূর্ব ইউরোপ বা বলকান অঞ্চলের এই দেশটি ২০০৯ সালে ন্যাটোর সদস্য হয়। ওসমানীয় খিলাফাহর যুগে আলবেনিয়া প্রায় ৫০০ বছর তুরস্কের অধীনে ছিল। ১৯১২ সালে দেশটি স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং ১৯২৫ সালে প্রজাতন্ত্র গঠিত হয়।

আলবেনিয়ায় মুসলিম জনগোষ্ঠির পরিমাণ মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশ মুসলিম।

ন্যাটোর সর্বশেষ সদস্য রাষ্ট্র কোনটি

২০২৩ সালে ফিনল্যান্ডের আগে ২০২০ সালে নর্থ মেসিডোনিয়া সর্বশেষ ন্যাটো জোটের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে যুক্ত হয়। এর আগে ২০১৭ সালে মন্টেনিগ্রো, ২০০৯ সালে আলবেনিয়া, ২০০৪ সালে বুলগেরিয়া, লিথুনিয়া, এস্তোনিয়া,  লাটভিয়া, স্লোভেনিয়া ও স্লোভাকিয়াকে ন্যাটোর সদস্য করা হয়।

এই লেখা যখন প্রকাশ করছি, তখন সুইডেনের সদস্যপদ প্রাপ্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসনের ফিনল্যান্ড ও সুইডেন ন্যাটোতে যোগ দেয়ার আবেদন করে ২০২২ সালের মাঝামাঝিতে।

কাগজে কলমে যাই থাক, ন্যাটো মূলত যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে রাশিয়া বিরোধী একটি সামরিক জোট হিসেবেই পরিচিত বিশ্বে।

ন্যাটো সৈন্যদের অবস্থান

যে কারণে ন্যাটোর প্রতিপক্ষ হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নের জায়গা নিয়েছে রাশিয়া। রুশ সীমান্তের কাছাকাছি এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুনিয়া ও পোল্যান্ডে মোতায়েন রয়েছে ন্যাটোর সেনাবাহিনী ও সমরাস্ত্র। আছে রোমানিয়া ও বুলগেরিয়াতেও। এর মধ্যে পোল্যান্ডে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ৪ হাজার ন্যাটো সৈন্য অবস্থান করছে। এছাড়া ফাইটার জেট, মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম ও ট্যাঙ্কসহ অনেক অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র মোতায়েন করা হয়েছে পূর্ব ও উত্তর ইউরোপে।

ন্যাটোর সদর দফতর কোথায় NATO Headquartrs

ন্যাটোর সদর দফতর বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে। সদর দফতরে গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ কর্মকর্তারা ছাড়াও সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধি, সামরিক-বেসামরিক লিয়াজো অফিসার, কূটনীতিক ও সদস্য দেশগুলোর সামরিক প্রতিনিধি, ন্যাটোর নিয়োগকৃত সামরিক কর্মকর্তারা নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

কিভাবে চলে ন্যাটো

ন্যাটোর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এর অভ্যন্তরে রয়েছে কিছু সংস্থা। রুটিন কার্যক্রম পরিচালনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য রয়েছে নর্থ আটলান্টিক কাউন্সিল। এটি এই জোটের বেসারিমক কমিটি। সদস্য দেশগুলোর বেসামিরক প্রতিনিধিরা এখানে কাজ করেন। কাউন্সিল প্রতি সপ্তাহে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য বৈঠকে বসে। কাউন্সিলের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন সেক্রেটারি জেনারেল।

এছাড়া রয়েছে একটি মিলিটারি কমিটি। এই কমিটির কাজ সামরিক নীতি ও কৌশল সম্পর্কে কাউন্সিলকে পরামর্শ দেয়া। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতিরক্ষা প্রধানরা এই কমিটির সদস্য। এই কমিটির প্রধান একজন চেয়ারম্যান, যিনি জোটের সামরিক অভিযানের নেতৃত্ব দেন।

ন্যাটোর সেনাবাহিনী

ইউরোকর্পস নামের ন্যাটোর একটি বাহিনী রয়েছে, যেটি যেকোন স্থানে দ্রুত মোতায়েনের জন্য রেডি ফোর্স হিসেবে রাখা হয়। ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গ শহরে এই বাহিনীর সদর দফতর। এছাড়া এই ফোর্সের অধীনে ছয় হাজার সেনার একটি বাহিনী আছে ফ্রান্স ও জার্মান সৈন্যদের নিয়ে। এছাড়া মাল্টিন্যাশনাল কর্পস, র‌্যাপিড ডেপলয়মেন্ট কর্পস, হাই রেডিনেস ফোর্সেস নামে পৃথক সেনাবহর রয়েছে ন্যাটোর। এই বাহিনীগুলো নিয়ন্ত্রণ করে অ্যালাইড কমান্ড অপারেশন্স ডিপার্টমেন্ট। এছাড়া ন্যাটো সাপোর্ট এজেন্সি, পার্লামেন্টারি অ্যাসেম্বেলি, কমিউনিকেশন এন্ড ইনফরমেশন এজেন্সি নামে এই জোটের পৃথক পৃথক বিভাগ রয়েছে।

ন্যাটোর সামরিক অভিযান

ন্যাটো (NATO) সৈন্যরা সদস্য দেশগুলোর বাইরে প্রথম অপারেশন চালায় ১৯৯০ সালে কুয়েত যুদ্ধে। তবে সে যুদ্ধে তাদের খুব একটা জোরালো ভুমিকা ছিলোনা। এরপর বসনিয়া যুদ্ধে ন্যাটো সৈন্যরা সার্ব বাহিনীর বিপক্ষে লড়াই করে। বিমান হামলা ও স্থল হামলা চালায় ন্যাটো। ন্যাটোর সামরিক হস্তক্ষেপের কারণেই বসনিয়দের ওপর সার্বদের গণহত্যা বন্ধ হয় এবং বসনিয়া স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

কসভোর মুসলিমদের ওপর সার্বদের গণহত্যার সময়ও ন্যাটো সৈন্যরা কসভোর পাশে দাড়িয়েছিলো। ওই সময় ন্যাটোর বিমান থেকে টানা ৭৮ দিন বোমা হামলা চালানো হয়েছে সার্বদের অবস্থানের ওপর। যার ফলে স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে কসভো।

কুয়েত, বসনিয়া ও কসভো যুদ্ধের এ অভিযানগুলো ছিলো নিরপেক্ষ কোন দেশের জন্য। তবে নিজেদের ওপর হামলা হলে ন্যাটোর যে সমন্বিত প্রতিরক্ষা পদ্ধতি সেটি তারা প্রথম প্রয়োগ করেছিলো আফগান যুদ্ধে। যুক্তরাষ্ট্রে নাইন ইলেভেন হামলার পর মার্কিন বাহিনীর পাশাপাশি ন্যাটো বাহিনীও যোগ দেয় ওই যুদ্ধে।  ইরাক ও লিবিয়ার যুদ্ধেও অংশ নিয়েছে ন্যাটো সৈন্যরা।

ন্যাটোর সামরিক ও অন্যান্য কর্মকাণ্ডের ব্যয় প্রধানত নির্বাহ করে যুক্তরাষ্ট্র। মোট ব্যয়ের চারভাগের তিন ভাগই দেয় ওয়াশিংটন। ন্যাটোর পেছনে ব্যয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রায়ই আপত্তি করতেন। তিনি চাইতেন সব সদস্য দেশ সমান হারে ন্যাটোর খরচ জোগান দেবে। তার সময়ে ন্যাটোর কার্যক্রম অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছিলো।

তবে ইউক্রেন ‍যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে উত্তেজনার কারণে এই সংস্থার কার্যক্রম আবার জোরালো হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top