যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ইলহান ওমর (Ilhan OMar) এক আলোচিত নাম। সোমালিয়ার একটি উদ্বাস্ত শিবির থেকে উঠে এসে যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্টে যাওয়া এই মুসলিম নারী সারা বিশ্বে পরিচিতি পেয়েছেন অল্প দিনেই। বিভিন্ন ইস্যুতে তার শক্ত অবস্থান এক দিকে যেমন তাকে জনপ্রিয় করেছে বিভিন্ন মহলে, অন্যদিকে চক্ষুশূল হয়েছেন ইহুদি লবি ও কট্টরপন্থীদের। হয়েছে হত্যার ষড়যন্ত্রও।
কিভাবে ইলহান ওমর পৌছেছেন আজকের অবস্থানে, কেনইবা তার সাথে বিভিন্ন মহলের শত্রুতা সেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো।

মার্কিন পার্লামেন্টে ইলহান ওমর
২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্ট নির্বাচনে ইলহান ওমরের বিজয়ী হওয়াটা ছিলো বেশ আলোচিত। অনেকগুলো প্রথম ঘটনার জন্ম দিয়েছে তার এমপি নির্বাচিত হওয়াটা। যেমনটা ইলহান নিজেই বলেছেন, ‘আজ রাতে অনেকগুলো ‘প্রথম’ বিশেষণের অধিকারী হিসাবে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়েছি প্রথম অশ্বেতাঙ্গ হিসাবে আমি এই স্টেটকে কংগ্রেসে প্রতিনিধিত্ব করতে চলেছি, হিজাব পরিহিত নারী হিসাবে কংগ্রেস যাচ্ছি, আমিই প্রথম শরণার্থী যে কংগ্রেসে নির্বাচিত হয়েছি, এবং প্রথম একজন মুসলিম নারী হিসাবে কংগ্রেসে যাচ্ছি।’
ইলহানের বিজয়টা কেন বিশ্বজুড়ে আলোচিত ছিলো সেটি তার কথাতেই ফুটে উঠেছে। সোমালি বংশোদ্ভূ’ত এই নারী শৈশবে তার বাবা ও দাদার সাথে পালিয়েছেন দেশ ছেড়ে, জীবনের বেশ কিছু বছর কাটিয়েছে উদ্বাস্তু শিবিরে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে একের পর এক সফলতার সিড়ি ভেঙে পৌছে গেছেন পার্লামেন্ট ভবনে। যে কারণে ওই সময় তার নির্বাচিত হওয়াটা ছিলো ব্যাপক আলোচিত।
ইলহান ওমর কে
১৯৮২ সালে আফ্রিকার দেশ সোমালিয়ার মোগাদিসুতে জন্ম ইলহান ওমরের। সাত ভাই বোনের মাঝে সবার ছোট ইলহান। বাবা নুর ওমর মোহাম্মাদ ছিলেন উত্তরপশ্চিম সোমালিয়ার একটি বিখ্যাত গোত্রের সন্তান। পেশায় ছিলেন সোমালি সেনাবাহিনীর কর্নেল, এরপর কাজ করেছে শিক্ষকদের প্রশিক্ষক হিসেবে। ইলহানের বয়স যখন ২ বছর তখন তার মায়ের মৃত্যু হলে বাবা ও দাদার তত্ত্বাবধানে বেড়ে উঠেছেন তিনি। দাদা ছিলেন সরকারের নৌ পরিবহন দফতরের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা।
পরিবারের আরো অনেকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি চাকরি করতেন। যে কারণে সামাজিকভাবে তাদের পরিবারটি মর্যাদাসম্পন্ন ছিলো। কিন্তু ইলহানের বয়স যখন ৮ বছর তখন সোমালিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। নিরাপদ জীবনের উদ্দেশ্যে ইলহানকে নিয়ে তার দাদা ও বাবা দেশ ছেড়ে পালান। তাদের আশ্রয় হয় কেনিয়ার সোমালিয়া সীমান্তবর্তী দাদাব নামের একটি উদ্বাস্তু শিবিরে।
উদ্বাস্তু হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র যাত্রা
সেখানে কয়েক বছর থাকার পর একটি বেসরকারি সংস্থার সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্রে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় পায় পরিবারটি। সেটি ছিলো ১৯৯৫ সাল। নিউইয়র্ক ও ভার্জিনিয়ায় কিছুদিন বসবাসের পর তারা স্থানী হন মিনিসোটা অঙ্গরাষ্ট্রের রাজধানী মিনিয়াপোলিস শহরে। কিছু দিন ট্যাক্সি চালানোর পর স্থানীয় একটি অফিসে চাকরি পান ইলহানের বাবা। আর স্থানীয় স্কুলে শুরু হয় ইলহানের লেখাপড়া।

স্কুল জীবন থেকে রাজনীতির প্রতি ঝোঁক তৈরি হয় ইলহানের। ১৪ বছর বয়সের সময় ইলহান তার দাদার সাথে একটি রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে যোগদেন, যেখানে তিনি তার দাদার দোভাষী হিসেবে কাজ করেন। স্কুল জীবন থেকেই হিজাব পড়তে অভ্যস্ত ইলহান পোশাকের কারণে স্কুলে বিভিন্ন বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। তবে স্কুলেই হিজাব নিয়ে সহপাঠীদের আচরণের প্রতিবাদ করতে শেখেন তিনি।
মুসলিম শিক্ষার্থী হিসেবে পশ্চিমা সমাজে এসব বাজে অভিজ্ঞতাই পরবর্তী জীবনে তাকে প্রতিবাদী হিসেবে গড়ে উঠতে সহযোগিতা করেছে। ২০০০ সালে পরিবারের অন্যান্যদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব লাভ করেন, যখন তার বয়স ছিলো ১৭ বছর।
২০০১ সালে স্কুল শিক্ষা শেষ করে ভর্তি হন নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ের ওপর স্নাতক ডিগ্রি নেন ২০১১ সালে। এছাড়া ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটার হাম্পারে স্কুল অব পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের পলিসি ফেলোশিপ পান ছাত্রজীবনেই। পড়াশোনা শেষ করে পেশাজীবন শুরু করেন মিনেসোটা ইউনিভার্সিটির কমিউনিটি নিট্রিশন এডুকেটর হিসেবে।
রাজনীতিতে ইলহান ওমর
২০১২ সালে সরাসরি জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। ওই বছর মিনেসোটা স্টেট রিপ্রেজেন্টেটিভস নির্বাচনে এক নারী প্রার্থীর হয়ে প্রচারনায় নামেন। পরের বছর মিনিয়াপোলিস সিটি কাউন্সিল নির্বাচনে এক প্রার্থীর ক্যাম্পেইন ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই প্রার্থী নির্বাচিত হলে তার দফতরে সিনিয়র পলিসি এইড হিসেবে যোগ দেন ইলহান। ওই সময় এক রাজনৈতিক বিতর্কসভায় তার ওপর হামলাও করে বিরোধীরা।
২০১৬ সালে মিনেসোটা স্টেট পার্লামেন্টে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন ডেমোক্র্যাট দলের হয়ে। বড় ব্যবধানে জয়ী হন। সফলভাবে স্টেট পালামেন্টে দায়িত্ব পালনের পর ইলহান জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা ঘোষণা করেন মিনেসোটার ফিফথ কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে। ২০১৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে প্রার্থী হন ডেমোক্র্যাট দলের টিকিটে।
রেকর্ড ভোট পেয়ে প্রথম সোমালি বংশোদ্ভ’ত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের এমপিদের তালিকায় নাম লেখান। একই সাথে রাশিদা তালিবের সাথে যৌথভাবে প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে কংগ্রেসে যান ইলহান। বাড়িতে সংরক্ষিত দাদার আমলের একটি কুরআন শরীফের ওপর হাত রেখে ২০১৯ সালের ৩ জানুয়ারি শপথ নেন কংগ্রেস সদস্য হিসেবে। যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্টে প্রথম হিজাব পরা এমপিও তিনি।

ব্যক্তিগত জীবনে ৩ সন্তানের জননী ইলহান ওমর। যে বাবার হাত ধরে কৈশোরে আমেরিকায় পা রেখেছিলেন ২০২০ সালের জুন মাসে তিনি মারা যান করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে।
ইলহান ওমরের রাজনৈতিক সংগ্রাম
রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকে প্রতিবাদী চরিত্রের ইলহান সাদাকে সাদা ও কালোকে কালো বলতে দ্বিধা করেন না। যে কারণে পার্লামেন্টে গিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সাথে শুরু হয় তার বিরোধ। ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞাসহ অভ্যান্তরীণ বিষয়ে যেমন কথা বলেছেন, তেমনি ইসরাইল ফিলিস্তিন সঙ্কট, ইয়েমেন যুদ্ধসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দ্বিধাহীনভাবে নিজের মত প্রকাশ করেছেন।
কংগ্রেসে যাওয়ার আগে থেকেই ইসরাইলের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে স্বোচ্চার ছিলেন ইলহান। ২০১২ সালে তিনি এক টুইটার পোস্টে লিখেছিলেন, ইসরাইল পুরো বিশ্বকে সম্মোহিত করে রেখেছে। আল্লাহ একদিন সবাইকে জাগিয়ে ইসরাইলের শয়তানি দেখাবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের এক তরফা ইসরাইল নীতি ও ওয়াশিংটনের ইহুদি লবির দাপটের বিরুদ্ধেও একাধিকবার কথা বলেছেন তিনি। প্রচণ্ডভাবে লড়াই করেছেন ইসলাম ফোবিয়া আর অভিবাসী বিদ্বেষের বিপক্ষে। যে কারণে কট্টর ডানপন্থী, উগ্র শ্বেতাঙ্গ আর ইসরাইলপন্থীরা তার শত্রু হয়ে দাড়ায়। ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে সোমালিয়ায় ফিরে যেতে বলেছেন। বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক সমাবেশে ট্রাম্প ইলহান ওমরের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েছেন।
ফক্স নিউজের মতো রক্ষণশীল সংবাদ মাধ্যমগুলো তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও টানাহেচড়া করতে চেষ্টা করেছে। নাইন ইলেভেন নিয়ে এক বক্তৃতার সূত্র ধরে তাকে আমেরিকাবিরোধী হিসেবে প্রমাণের চেষ্টাও কম হয়নি।
আরো পড়ুন :
হুমকি ও দোষারোপ
এখানেই শেষ নয়, এসব করতে গিয়ে ইলহান ওমরের জীবনের ওপরও হুমকি তৈরি হয়েছে। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন কোস্ট গার্ড বাহিনীর এক লেফট্যানেন্টকে গ্রেফতার করে এফবিআই। শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী সেই কর্মকর্তা ইলহান ওমরসহ বেশ কিছু নেতাকে হত্যার পরিকল্পনা করছিলো। একই বছর এপ্রিলে প্যাট্রিক ক্যারোলিন নামের আরেক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয় ইলহান ওমরকে টেলিফোনে হত্যার হুমকি দেয়ার কারণে। গ্রেফতারের পর ওই ব্যক্তি জানায়, কোন মুসলিমকে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারে দেখতে চায় না সে। ওই বছর আরো কয়েক দফা হত্যার হুমকি পান ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থকদের কাছ থেকে। এক পর্যায়ে পুলিশের কাছে বাড়তি নিরাপত্তাও চান তিনি।
এছাড়া ইলহানের বিরুদ্ধে ইরানের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ আনেন কংগ্রেসে তার আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী। এ জন্য তিনি ইলহান ওমরের মৃত্যুদণ্ড দাবি করেন। আরেক রিপাবলিকান নেতা বলেন, রাষ্ট্রদ্রোহীতার দায়ে ইলহানের মৃত্যুদণ্ড হবে। তার দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
এসব সহ্য করেই ইলহান ওমরকে তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার এগিয়ে নিতে হচ্ছে। এবং সফলভাবেই যে তিনি সেটি করতে পারছেন তা প্রমাণ হয়েছে ২০২০ সালের নির্বাচনেও তার পুননির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে।
প্রতিবাদী ইলহান ওমর
প্রতিবাদ করা যার চরিত্রের মাঝে থাকে, তিনি তো বিশ্বের যে কোন প্রান্তের অনিয়ম নিয়েই কথা বলবেন। উইঘুর মুসলিমদের ওপর চীনা সরকারের নীপিড়নের বিরুদ্ধেও কথা বলেছেন ইলহান। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো প্রসঙ্গে ওয়াশিংটন পোস্টে লেখা এক কলামে তিনি লিখেছেন, আমরা যদি ইরানকে অস্থিতিশীলতা ও নিপীড়নের জন্য দোষী করি, তা সঠিক হবে না যদি আমরা একই ধরণের অপরাধের জন্য মিসর, আরব আমিরাত, বাহরানেই মতো দেশগুলোর বিষয়ে চুপ থাকি। এমনকি সৌদি আরবের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও আমরা চোখ বুজে থাকতে পারি না।’
সিরিয়ার গণতন্ত্রপন্থী জনগনের ওপর বাশার আল আসাদের নির্যাতন তার চোখ এড়ায়নি। ইরানের ওপর ট্রাম্পের নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপেরও ঘোর বিরোধী ছিলেন ইলহান। বিভিন্ন দেশে মার্কিন বাহিনীর যুদ্ধের বিরোধীতা করেন সব সময়। এক বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে নিরাপদ রাখতে দেশের বাইরে ৮০০ সামরিক ঘাঁটির প্রয়োজন নেই। যুদ্ধে এত অর্থ খরচ না করে সে অর্থ স্বাস্থ্যখাতে খরচের দাবি করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী ও কালোদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সব সময়ই তিনি সামনের সাড়িতে ছিলেন। ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনের সময় মিনেসোটার পুলিশ বাহিনীকে তহবিল বন্ধ করার পক্ষে আন্দোলনে তার বড় ভুমিকা ছিলো। ছাত্রদের ঋণ মওকুফ, সবার জন্য বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ইস্যুতেও কাজ করেছেন এই এমপি।
সর্বশেষ ২০২২ সালের জুলাই মাসেও গর্ভপাত নিষিদ্ধের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে ওয়াশিংটন ডিসিতে গ্রেফতার হন ইলহান ওমর। একই বছর নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিপুল ভোটে আবারো পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হন।


