রোনালদো পিক

রোনালদো ও তার নতুন ক্লাবের গল্প

সৌদি আরবের ঘরোয়া ফুটবলে নাম লিখিয়েছেন পর্তুগিজ তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো । মঙ্গলবার আল নাসর ক্লাব কর্তৃপক্ষ তাকে দিয়েছে রাজকীয় সংবর্ধনা। ইউরোপের ফুটবলে সব কিছু জেতা রোনালদোর সৌদি আরবে খেলতে আসা- অবাক করেছে সমর্থকদের। তবে রোনালদো বলেছেন, ইউরোপের পর এবার এশিয়ার ফুটবলে কিছু করে দেখাতে চান তিনি। যদি সেটা পারেন, তাহলে হয়তো বদলে যাবে আল নাসর ক্লাব এবং গোটা সৌদি আরবের ফুটবলের চেহারা। চ্যালেঞ্জ নিতে পছন্দ করা সিআর সেভেন জেনে শুনেই এই পথে পা বাড়িয়েছেন।
রোনালদোর সৌদি আরবে আসা এবং তার ক্লাব আল নাসরের নানা দিক এই লেখায়

রোনালদো ও তার সৌদি যাত্রা

০৩ জানুয়ারি রাতে একজন বাংলাদেশী ফুটবল বিশ্লেষক তার ফেসবুক পেজে লিখেছেন, ‘সৌদি আরব রাজা-বাদশাহ’র দেশ। তারা জানে একজন রাজাকে কিভাবে সম্মান দিতে হয়।’

রিয়াদে যে জমকালে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে রোনালদোকে আল নাসর ক্লাবের সমর্থকদের সামনে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়- সেটাকে উদ্দেশ্য করেই বলা হয়েছে কথাগুলো। আল নাসরের হোম ভেন্যু এমআর সুল পার্কে মঙ্গলবার ফুটবলপ্রেমীদের মেলা বসেছিলো। যে মেলার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো।
সৌদি আরবের ক্লাবটির সাথে সিআর সেভেনের চুক্তি স্বাক্ষরের কথাটা প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই সৌদি ফুটবল প্রেমীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছেন- কবে আসবে তাদের ভালোবাসার রাজপুত্র।

তাদের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সোমবার স্ব-পরিবারে রিয়াদে পা রাখেন তিনি। সেখানে তাকে স্বাগত জানান ক্লাব কর্মকর্তারা। এয়ারপোর্ট থেকে হোটেল পর্যন্ত সর্বত্রই রোনালদোর জন্য ছিলো বিশেষ আয়োজন। পথে পথে ছিলো ফুটবল প্রেমীদের অপেক্ষা।

রোনালদোর পিক
নতুন ঠিকানায় রোনালদো

আর পরদিন আল নাসরের হোম ভেুন্যতে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে ভক্তদের সামনে পরিচয় করিয়ে দেয়ার অনুষ্ঠানকে জমকালে বললেও কম বলা হবে। ২৫ হাজার দর্শক ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন স্টেডিয়ামটি ছিলো কানায় কানায় পূর্ণ। দর্শক ছাড়াও স্বেচ্ছাসেবক, ক্লাব কর্মকর্তা, সৌদি সরকারের কর্মকর্তাসহ আরো উপস্থিত ছিলেন সহ¯্রাধিক লোক। আতশবাজি আর আলোকসজ্জা ছিলো চোখধাধানো। এর বাইরে টিকিট না পেয়ে হতাশ হয়েছেন আরো অন্তত ২৫ হাজার ফুটবলপ্রেমী।

আল নাসর ক্লাব

ক্লাবের জার্সি পরে রোনালদো যখন মাঝমাঠে আসেন- চারদিকে তখন শুধু সিআর সেভেন চিৎকার ছাড়া কিছুই শোনা যায়নি। উপস্থাপিকা যখন রোনালদোর কাছে জানতে চান- সৌদি আরবে এসে তার কেমন লাগছে- এর জবাবে রোনালদো মুখে কিছু না বলে- শুধু গ্যালারির দিকে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দেন। যেন তার অনেক না বলা কথা লুকিয়ে ছিলো দর্শকদের সেই চিৎকারের মাঝে।

সৌদি আরবের ঘরোয়া ফুটবলে রোনালদোই এ যাবতকালের সবচেয়ে বড় তারকা। এমন নয় যে, আল নাসর সৌদি আরবের সবচেয়ে প্রভাবশালী ক্লাব। এমনকি নিজ শহর রিয়াদেরও সেরা ক্লাব নয় আল নাসর। তবু এরকম একটি ক্লাবকে ৫ বারের ব্যালন ডি’অর জয়ী রোনালদো কেন বেছে নিয়েছেন সেটি অনেকের কাছেই রহস্য মনে হচ্ছে।

১৯৫৫ সালে আল নাসর ক্লাবটি প্রতিষ্ঠা করেন স্থানীয় ক্রীড়া সংগঠন জেইদ আল জাবা ও তার ভাই হুসাইন। জেইদ ছিলেন ক্লাবের প্রথম সভাপতি। প্রথম দিকে অপেশাদার হিসেবেই খেলতো ক্লাবটি। রিয়াদের সবচেয়ে পুরাতন আল ফুতাহ মাঠে চলতো অনুশীলন। তবে ১৯৬০ সালে রাজপরিবারের এক সদস্যের দৃষ্টিতে পরার পরই পাল্টে যায় ক্লাবটির ভাগ্য।

সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আবদুল আজিজের নাতি ও দ্বিতীয় বাদশাহ আল সৌদ এর পুত্র প্রিন্স আবদুল রহমান ওই সময় ক্লাবটির সাথে জড়িত হন। তার আগ্রহেই ক্লাবটি সৌদি ফুটবল ফেডারেশনে নিবন্ধিত হয় এবং দ্বিতীয় বিভাগের লিগে খেলতে শুরু করে। আল নাসর ক্লাবের ওয়েবসাইটে প্রিন্স আবদুল রহমান সম্পর্কে লেখা হয়েছে- নেতা, যোদ্ধা, মানবাধিকার কর্মী ও একজন অনুপ্রেরণাদায়ী মানুষ।

কেমন ক্লাব আল নাসর

দীর্ঘ চার দশক ক্লাবটিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন রাজপরিবারের এই প্রভাবশালী সদস্য। ২০০৪ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি ক্লাবটিকে শীর্ষ পর্যায়ে নিয়ে যেতে অনেক ভুমিকা রেখেছেন। তার মৃত্যুর পর রাজপরিবারের আরো কয়েকজন সদস্য ক্লাবটিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আর বর্তমানে আল নাসরের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন খ্যাতিমান ক্রীড়া সংগঠক মুসাল্লি আল মুয়াম্মার।

পেশাদার ফুটবলে নাম লেখানোর মাত্র ৩ বছরের মাথায় আল নাসর সৌদি প্রো লিগে উঠে যায়। যার মাধ্যমে পেশাদার সার্কিটের শীর্ষ পর্যায়ে পথচলা শুরু হয় ক্লাবটির। আর ক্লাবটি সফলতা পেতে শুরু করে ১৯৭০ ও আশির দশকে। ওই সময় সৌদি আরবের সেরা তিন ফুটবলার এক সাথে খেলতেন আল নাসর ক্লাবে। যার ফলে ৪টি লিগ শিরোপা, দুটি ফেডারেশন কাপ, ছয়টি কিংস কাপ ও তিনটি ক্রাউন প্রিন্স কাপ জেতে আল নাসর।

মাজেদ আবদুল্লাহ সৌদি আরবের সর্বকালের সেরা ফুটবলার। প্রো লিগে ১৯৪ ম্যাচে গোল করেছেন ১৮৯টি। এখনো তার রেকর্ড কেউ ভাঙতে পারেনি। আন্তর্জাতিক ফুটবলেও সৌদি আরবের হয়ে ৭২টি গোল আছে এই ফরোয়ার্ডের। তার সাথে ছিলেন ফাহাদ আল হেরাফি ও মোহাইসন আল জাম’য়ান। এই তিনজনকে বলা হয় সৌদি ফুটবলের ত্রিরতœ। তিনজনই ক্যারিয়ারের পুরোটা সময় খেলেছেন আল নাসর ক্লাবে।

১৯৯০ এর দশকেও তারা ক্লাবটিকে ২টি লিগ শিরোপা ও একটি করে কিংস কাপ ও ফেডারেশন কাপ শিরোপা জিতিয়েছেন। এছাড়া এনে দিয়েছেন উপসাগরীয় দেশগুলোর ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর জিসিসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা এবং একটি করে এশিয়ান কাপ ও এশিয়ান সুপার কাপ।

এশিয়ার প্রথম দল হিসেবে এই ক্লাবটি ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপে খেলেছে। তবে ওই তিন তারকার অবসরের পর আল নাসর অনেক বছর ভালো নৈুপণ্য দেখাতে পারেনি। এমনকি ২০০৭ সালে তারা অনেক কষ্টে রেলিগেশন ঠেকিয়েছে।

স্বপ্ন দেখাচ্ছেন রোনালদো

এরপর গত ১০ বছরে তিনবার লিগ শিরোপা জিতলেও পুরনো দাপট হারিয়ে গেছে ক্লাবটির। সর্বশেষ তিনটি মৌসুমে লিগ জিতেছে তাদেরই নগর প্রতিদ্বন্দ্বী আল হিলাল এফসি। এবার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে পাওয়ার পর আল নাসর আবার আশাবাদী হয়ে উঠেছে লিগ শিরোপা জেতা এবং এশিয়ান ফুটবলে ভালো করার।

বর্তমানে ক্লাবটির স্কোয়াডে আছেন একাধিক বিদেশী আন্তর্জাতিক ফুটবলার। ক্যামেরুনের স্ট্রাইকার ভিনসেন্ট আবু বকর- যার একমাত্র গোলে এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে হারিয়েছে ক্যামেরুন। আছেন বেনিফিকার সাবেক ফরোয়ার্ড তালিসকা, কলম্বিয়ার জাতীয় দলের গোলরক্ষক ডেভিড অসপিনা এবং বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতা ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার লুইস গুস্তোভা।

আল নাসরের বর্তমান কোচেরও আছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা। এখানে আসার আগে তিনি কোচের দায়িত্ব পালন করেছেন ফ্রান্সের দুই ক্লাব মার্শেই ও লিঁও’র।

সৌদি আরবে নেমেই রোনালদো বলেছেন, তিনি আল নাসরের সমর্থকদের আনন্দ দিতে চান। আর চান নিজের সেরাটা দিতে। ক্লাবটিও চাইছে রোনালদোর পেছনে তাদের কাড়ি কাড়ি টাকা খরচের বিনিময়ে ফুটবল বিশে^ নিজেদের উপস্থিতি নতুন করে জানান দিতে।

গত গ্রীষ্মে রোনালদো যখন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ছাড়েন, তখন অনেকেই ভেবেছিলো তিনি ইউরোপের কোন ক্লাবেই যাবেন। কয়েক বছর আগে রোনালদো নিজেও বলেছিলেন, ইউরোপ থেকেই নিজের ক্যারিয়ার শেষ করতে চান; কিন্তু তিনি শেষ পর্যন্ত এমন একটি ক্লাবে গেলেন- যারা এশিয়ার শীর্ষ পর্যায়েও খেলতে পারছে না। চলতি বছর সৌদি প্রো লিগে তৃতীয় হওয়া এবং অন্য কোন কাপ না জেতায় আল নাসর এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলার সুযোগ হারিয়েছে।

এবং ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো

অথচ রিয়াদেরই আরেক ক্লাব আল হিলাল চারবার এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছে। জেদ্দার আল ইতিহাদ ক্লাব জিতেছে দুই বার। আল নাসর ঘরোয়া লিগে সব মিলে ৯ বার লিগ শিরোপা জিতলেও মহাদেশীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে তাদের সফলতা শূন্য। উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে সর্বোচ্চ গোলের রেডর্ক গড়া রোনালদোর জন্য এমন এক ক্লাবের খেলা হবে নতুন অভিজ্ঞতা এবং অনেক বড় চ্যালেঞ্জ।

এতদিন এল ক্লাসিকো, মাদ্রিদ ডার্বি আর ম্যানচেস্টার ডার্বি খেলে আসা রোনালদোকে এবার মাঠে নামতে হবে রিয়াদ ডার্বিতে। যেখানে শক্তিমান আল হিলালের বিরুদ্ধে তার ওপর ভরসা করেই মাঠে আসবেন দর্শকরা।

চলতি মৌসুমে ক্লাবটি এখন পর্যন্ত পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে রয়েছে। এরই মধ্যে যোগ দিয়েছেন বিশে^র সেরা তারকাদের একজন। কাজেই ক্লাবটির জন্য এখন সামনে এগিয়ে যাওয়ার বড় সুযোগ।

আল নাসর ক্লাবের পাশাপাশি সৌদি সরকারের ফুটবল কর্তৃপক্ষও চাইছে রোনালদোর উপস্থিতিকে নিজেদের ফুটবলের বিস্তারে কাজে লাগাতে। রোনালদোর আগমনে দেশটির ফুটবলে নতুন জোয়ার আসবে বলে আশা তাদের। ২০৩০ সালের ফুটবল বিশ্ব কাপের যৌথ আয়োজক হওয়ার যে আগ্রহ সৌদি আরবের রয়েছে, সেটাও আরো জোরদার হবে বলে বিশ্বস তাদের।

তবে সব কিছুর আগে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে মাঠে সফল হতে হবে আল নাসর ক্লাবের হয়ে। যেমনটা ম্যারাডোনা পেরেছিলেন নাপোলিতে। ইতালির অখ্যাত এক ক্লাবকে তিনি তুলেছিলেন বিশ^সেরাদের কাতারে। ক্যারিয়ারের শেষ বেলায় এসে ৩৭ বছর বয়সী রোনালদো কি সেটা পারবেন? জানতে হলে অপেক্ষা করতে হবে আরো কিছুদিন।

০৪-০১-২০২৩

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top