গ্রিনল্যান্ড পিক

গ্রিনল্যান্ড এর মালিকানা কোন দেশের

গ্রিনল্যান্ড

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে খ্যাতিমান রিয়েল স্টেট ব্যবসায়ী ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। নতুন নতুন জমি কিনে অ্যাপার্টমেন্ট কিংবা বিলাসবহুল ভিলা বানানোই ছিলো তার ব্যবসায়। সেই ট্রাম্প কিনতে চাইলেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড। খোদ যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ মাধ্যমগুলোই যাকে বলেছে, ট্রাম্পের সর্ববৃহৎ রিয়াল স্টেট ডিল; কিন্তু কেন ট্রাম্প দ্বীপটি কিনতে চাইলেন? সারা বছরই বরফে ঢেকে থাকা দ্বীপটির নামই বা কেন রাখা হলো গ্রিনল্যান্ড। প্রচণ্ড শীতল আবহাওয়ায় কিভাবে বাস করে এখানকার বাসিন্দারা? গ্রিনল্যান্ড এর মালিকানা কোন দেশের – সেসব জানবো এই লেখায়

অফিশিয়াল নাম : গ্রিনল্যান্ড
রাজধানী : নুক
ডেনমার্কের অধীন : ১৮১৪
স্বায়ত্বশাসন লাভ : ১৯৭৯
নিজস্ব শাসনব্যবস্থা লাভ : ২০০৯
আয়তন : ২১ লাখ ৬৬ হাজার বর্গকিলোমিটার
জনসংখ্যা : ৫৬ হাজার
প্রধান জাতিগোষ্ঠি : গ্রিনল্যান্ডিক ইনুইট
অফিশিয়াল ভাষা : গ্রিনল্যান্ডিক
মুদ্রা : ডেনিশ ক্রোনা
ধর্ম : প্রধানত প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টান
সরকার ব্যবস্থা : বহুদলীয় গণতন্ত্র
হেড অব স্টেট : দ্বিতীয় মারগ্রেথ (ডেনমার্কের রানী)
পার্লামেন্ট : ইনাটসিসারটুট (এক কক্ষবিশিষ্ট)

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দ্বীপ কোনটি

কেতাবি সংজ্ঞায় অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের সবচেয়ে বড় দ্বীপ হলেও সেটি একটি আলাদা মহাদেশ হিসেবেই পরিচিত। তাই বিশ্বের সবচেয়ে বড় দ্বীপের তকমাটা পেয়েছে গ্রিনল্যান্ড। অন্তত সাড়ে চার হাজার বছর আগে থেকে এই দ্বীপে মানববসতি ছিল বলে গবেষকদের ধারণা। যারা এসেছিল আজকের কানাডা থেকে। ১০ম শতাব্দীতে আইসল্যান্ড থেকে আসে নর্সম্যানরা। আর ইনুইট জাতির লোকেরা গ্রিনল্যন্ডে এসেছিল ত্রয়োদশ শতাব্দীতে।

আজকের গ্রিনল্যান্ডে ইনুইটরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। উত্তর কানাডা পাড়ি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা থেকে তাদের পূর্বপুরুষরা এসেছিল এখানে। মধ্যযুগে কয়েকশ বছর নরওয়েজিয়ান ও পর্তুগিজদের দখলে থাকার পর ১৮১৪ সালে ডেনমার্কের অধীনে আসে অঞ্চলটি।

জনসংখ্যার হিসেবে তাদের সংখ্যা ৮৮ শতাংশ। ইনুইটরা দেখতে সাধারণত বেঁটে ও স্বাস্থ্যবান গড়নের হয়ে থাকে। তাদের নাক চ্যাপ্টা, চুল কালো ও খাড়া। গ্রিনল্যান্ড ছাড়াও আইসল্যান্ড, সুইডেন, নরওয়ে, জার্মানিতে কিছু ইনুইট জাতির লোকদের বসবাস রয়েছে।

আয়তনে বিশাল ভূখণ্ড হলেও গ্রিনল্যান্ডের ৮১ শতাংশ এলাকাই সারা বছর বরফে ঢাকা থাকে। এই এলাকাগুলো বসবাসের অযোগ্য। কোথাও কোথাও বরফের স্তরের পুরুত্ব তিন কিলোমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। গ্রীনল্যান্ডের বরফ গলে গেলে পৃথিবীর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২৩ ফুট পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে, যার ফলে ডুবে যাবে অনেক দেশ ও শহর। বিশ্বব্যাপী উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলেই চলেছে। যে কারণেই পরিবেশ বিজ্ঞানীরা কার্বন নিঃসরণসহ উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণ হ্রাস করতে বারবার আহ্বান জানাচ্ছেন রাষ্ট্রনেতাদের প্রতি।

গ্রিনল্যান্ড কোথায় অবস্থিত

ভৌগলিকভাবে উত্তর আমেরিকা মহাদেশে অবস্থিত হলেও দ্বীপটি রাজনৈতিকভাবে ইউরোপের সাথে যুক্ত। কারণ দ্বীপটি উত্তর ইউরোপের দেশ ডেনমার্কের স্বার্বভৌমত্বের অংশ। ডেনমার্কের একটি স্বশাসিত অঞ্চল এটি। যদিও আয়তনে গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের চেয়ে ৫০গুন বড়। আটলান্টিক ও আর্কটিক মহাসাগরের মাঝে অবস্থিত এটি।

১৯৭৯ সালে স্থানীয়ভাবে সরকার গঠন করে শাসনের অনুমতি পায় গ্রিনল্যান্ড। আর ২০০৯ সালে লাভ করে পূর্ণমাত্রার সায়ত্বশাসন। পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলোর সায়ত্বশাসিত অঞ্চলের চেয়ে গ্রিনল্যান্ডের সরকার অনেক বেশি অধিকার ভোগ করে। গ্রিনল্যান্ডে স্থানীয় একটি পার্লামেন্ট রয়েছে ৩১ সদস্য বিশিষ্ট। তবে রাষ্ট্রপ্রধান ডেনমার্কের রানী। রানীর প্রতিনিধি হয়ে একজন হাইকমিশনার নিযুক্ত থাকেন সেখানে।

ভিডিও প্রতিবেদন দেখুন

অন্যদিকে ডেনমার্কের পার্লামেন্টের দুজন এমপি নির্বাচিত হন গ্রিনল্যান্ড থেকে। আর গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষাসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দফতরও ডেনমার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। উচ্চমাধ্যমিকের পর শিক্ষার্থীরা ডেনমার্কে পড়াশুনার সুযোগ পায়। এ কারণে অধিবাসীদের নতুন প্রজন্ম দিনে দিনে স্বকীয়তা ভূলে মিশে যাচ্ছে ডেনিশ সংস্কৃতির সাথে। প্রধানত ইনুইট গোত্রের লোকেদেরই বসবাস গ্রিনল্যান্ডে। টপিক : গ্রিনল্যান্ড এর মালিকানা কোন দেশের

গ্রিনল্যান্ড কেমন দ্বীপ

ডেনমার্কের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের একটি দাবিও দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে গ্রিনল্যান্ডে। প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল ফরোয়ার্ড পার্টি ও ডেমোক্র্যাটিক সোসালিস্ট ইনুইট পার্টি স্বাধীনতাপন্থী দল। তবে বিভিন্ন কারণে সেই দাবি খুব একটা জোরালো হচ্ছে না।

গ্রিনল্যান্ডের পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকায় রয়েছে মানব বসতি। দ্বীপটির রাজধানী নুকসহ প্রধান শহরগুলোও এই অঞ্চলে। নুক শহরে ১৭ হাজারের কিছু বেশি মানুষের বসবাস। এখানে উপকূলের কাছাকাছি রয়েছে কয়েক হাজার ছোট ছোট দ্বীপ। প্রায় সারা বছর বরফে ঢেকে থাকার কারণে গ্রিনল্যান্ডে সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা মোটেই ভালো নয়। বিশাল বরফের পাহাড় বা হিমবাহ তো রয়েছেই। তাই প্রধান প্রধান শহরগুলোর মধ্যে নেই কোন সড়ক যোগাযোগ।

বিমান ও নৌ যোগাযোগই প্রধান ভরসা। গ্রিনহাউজ পদ্ধতিতে অল্প কিছু কৃষি কাজ হয় দেশটিতে, তবে তা স্থানীয় চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়, তাই খাদ্যের প্রধান উৎস আমদানি। আর নাগরিকদের বেশির ভাগই মৎসজীবী। রফতানি আয়ের ৯০ শতাংশ আসে এই খাত থেকে। তবে এসব আয় থেকে সব ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব হয় না। তাই প্রতিবচর গ্রিনল্যান্ডের অর্থনীতিতে বড় অঙ্কের ভতুর্কি দেয় ডেনমার্ক।

গ্রিনল্যান্ডের আবহাওয়া

বরফ আচ্ছাদিত হওয়ার কারণে গ্রিনল্যান্ডে সারা বছরই শীত থাকে। যদিও স্থানীয়দের ভাষায় সেখানে আসে গ্রীষ্ম ও বসন্তকাল। তবে সেই গ্রীষ্মের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা থাকে বড়জোর ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গ্রীষ্মে পশ্চিম উপকূলীয় এলাকার বরফ গলে যায়। এসময় কিছু সবুজও চোখে পড়ে। গ্রিনল্যান্ডে জুন থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত গ্রীষ্মকাল তবে মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের বরফ কখনোই গলে না।

এলাকাভেদে গ্রিনল্যান্ডের আবাহওয়ায় বড় পার্থক্য রয়েছে। রাজধানী নুক শহরে গ্রীষ্মে গড় তাপমাত্রা থাকে ৬ থেকে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর শীতে মাইনাস ৮ ডিগ্রি। উত্তরের শহরগুলোতে শীতের তীব্রতা বেশি। যেমন আপারনেভিকে ফেব্রুয়ারির গড় তাপামাত্র মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

গ্রীষ্মে অর্থাৎ জুন মাসেও এই শহরের তাপমাত্রা মাইনাস ২ ডিগ্রির আশপাশে থাকে। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে সারা দেশেই নামে প্রচণ্ড শীত। নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত পুরো দেশটিই থাকে বরফ হয়ে। এপ্রিলের পর থেকেই ক্রমশ কমতে শুরু করে ঠাণ্ডা।

উত্তর মেরুর কাছাকাছি হওয়ার কারণে গ্রিনল্যান্ডে দিন রাতের সময়েও বড় পার্থক্য রয়েছে। রাজধানী নুক শহরে ডিসেম্বরে সূর্যের আলো থাকে মাত্রা ৪ থেকে সাড়ে ৪ ঘণ্টা। তবে সেটাও খুব উজ্জল নয়। সকাল ১০টায় সূর্য ওঠে আবার বেলা আড়াইটার দিকে ডুবে যায়। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির পর থেকে ক্রমশই ডেলাইট টাইম বাড়তে থাকে। জুনে দিনের আলো থাকে সাড়ে ২১ ঘণ্টা।

অর্থাৎ তখন সূর্য ডোবার তিন ঘণ্টা পরই আবার নতুন সূর্য উঠতে শুরু করে। রাত তিনটার আগেই সূর্যোদয় শুরু হয়, আবার ডোবে পরদিন রাত সাড়ে বারোটার দিকে। এই সময়ই দেখা যায় মিডনাইট সান, যাকে বাংলায় বলা যায় মধ্যরাতের সূর্য বা নিশীথ সূর্য। আর দেখা যায় আকাশে বিভিন্ন রঙের খেলা, যাকে বলা হয় অরোরা।

গ্রিনল্যান্ড কিনতে চান ডোনাল্ড ট্রাম্প

২০১৯ সালের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হঠাৎ করেই  গ্রিনল্যান্ড দ্বীপ কিনে নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। শুরুতে বিষয়টি আপাদমস্তক একজন রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীর খেয়ালি চিন্তা হিসেবে ভাবা হলেও পরবর্তীতে জানা গেছে এর পেছনে রয়েছে গ্রিনল্যান্ডের বরফের নিচে লুকায়িত প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ। প্রচলিত ধারার খনিজ সম্পদগুলোর বাইরেও গ্রিনল্যান্ডে রয়েছে বিরল কিছু ধাতু ও পাথরের প্রাচুর্য- যেগুলো বিশ্বের আর কোথাও নেই।

বিরল ধাতু যেমন নিওডিমিয়াম, প্রাসিওডিমিয়া, ডিসপ্রোসিয়মিয়া, টারবিয়াম রয়েছে এখানে। এছাড়া ইউরেনিয়াম, লোহা তো রয়েছেই। এখানে আকরিক মজুদের পরিমান একশ মিলিয়ন টনের বেশি বলে ধারণা করা হয়। মোবাইল ফোন, কম্পিউটার ও ইলেকট্রিক কার তৈরিতে কিছু বিরল ধাতু ব্যবহৃত হয়, যা চীন ছাড়া অন্য কোন দেশে নেই। গ্রিনল্যান্ডে এ ধরণের ধাতু খুজে পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী যুক্তরাষ্ট্র।

এসব কারণেই ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড কেনার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন; কিন্তু আনুষ্ঠানিক কোন প্রস্তাব দেয়ার আগেই ডেনমার্ক জানিয়ে দিয়েছে- দ্বীপটি বিক্রির জন্য নয়। যে কোন দেশ সেখানে ব্যবসায় করতে পারবে। টপিক : গ্রিনল্যান্ড এর মালিকানা কোন দেশের

গ্রিনল্যান্ড সবুজ নয়

বিশ্বের ইতিহাসে অবশ্য ভূখণ্ড কেনাবেচার ঘটনা যে নেই- তেমনটি নয়। প্রেসিডেন্ট এন্ড্রু জনসনের সময় যুক্তরাষ্ট্র আলাস্কা অঞ্চল কিনে নিয়েছিল রাশিয়ার কাছ থেকে।

৭২ লক্ষ মার্কিন ডলারের সেই কেনাবেচাটি হয়েছিল ১৮৬৭ সালে। তবে তারও আগে ১৮০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র তার লুইজিয়ানা অঙ্গরাষ্ট্রটি কিনেছিল ফ্রান্সের কাছ থেকে। প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসনের সরকার সেই সওদাটি করেছিল ১ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলারে।

গ্রিনল্যান্ডে অবশ্য অনেক আগ থেকেই মার্কিন উপস্থিতি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর একটি ঘাটি রয়েছে যার নাম থুল এয়ার বেস। এটি স্থাপিত হয়েছে ১৯৪৩ সালে। এই ঘাঁটিতে মোতায়েন রয়েছে সেন্সর যুক্ত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ও পুরো অঞ্চলের আকাশপথে নজরদারির ব্যবস্থা। এছাড়া ডেনমার্কেরও সামরিক ঘাটি আছে দ্বীপটিতে।

হত্যাকাণ্ডের দায়ে নরওয়ে বংশোদ্ভূত নর্স জাতিগোষ্ঠির এরিক দ্য রেডকে মধ্যযুগে আইসল্যান্ড থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল। নিজের পরিবার ও অনুগত লোকজনকে নিয়ে জাহাজে চড়ে বরফে ঢাকা দ্বীপটিতে গিয়ে পৌছান এরিক। সেখানেই বসবাস করতে শুরু করেন। তিনিই দ্বীপটির নামকরণ করেন গ্রিনল্যান্ড- বরফে ঢাকা ভূখণ্ডের এমন নামকরণের পেছনে তার উদ্দেশ্য ছিলো, নাম শুনে এখানে বসতি স্থাপন করতে ছুটে আসবে মানুষ।

আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন : আহমেদ স্টোর

১৯-০৭-২০২০

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top