South China Sea

দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে লড়াই

পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কীত এক জলরাশি দক্ষিণ চীন সাগর বা South China Sea. অন্তত ১০টি দেশ এই সাগরের বিভিন্ন অংশের মালিকানা দাবি করে। তবে চীন দাবি করে এই সাগরের প্রায় সবটাই। এই দাবির বিরুদ্ধে করা মামলায় আন্তর্জাতিক আদালত রায় দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। আবার ভূরাজনৈতিক কারণে এই সাগরের গুরত্ব বেশি হওয়ার কারণে এই বিরোধ জড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রও। কয়েক দশক ধরে চলে আসা এই বিরোধ কূটনৈতিক উপায় সমাধান না হওয়ায় এ নিয়ে সামরিক সঙ্ঘাতের আশঙ্কাও করা হচ্ছে। দক্ষিণ চীন সাগরের অবস্থা-অবস্থান এবং এর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক গুরুত্ব নিয়ে এই প্রতিবেদন।

দক্ষিণ চীন সাগর কোথায়

দক্ষিণ চীন সাগরের সমুদ্রসীমার মোট আয়তন ৩৫ লক্ষ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে রয়েছে বিশাল এলাকা জুড়ে চীনের উপকূল। পশ্চিম দিকে ভিয়েতনাম দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ব্রুনাই। পূর্বে আছে ফিলিপাইন ও তাইওয়ান। পূর্ব দিকে সাগরটি তাইওয়ান প্রণালী দিয়ে পূর্ব চীন সাগর, লুজন প্রণালী দিয়ে ফিলিপাইন সাগর এবং মিন্দোরা ও বালাবাক প্রণালী দিয়ে সুলু সাগরের সাথে যুক্ত হয়েছে।

পূর্ব দিকে এর সংযোগ আছে থাইল্যান্ড উপসাগর আর দক্ষিণে আছে জাভা সাগর। কেউ কেউ অবশ্য থাইল্যান্ড উপসাগরকেও দক্ষিণ চীন সাগরের অংশ বলে মনে করেন।

দক্ষিণ চীন সাগরের ম্যাপ
মানচিত্রে দক্ষিণ চীন সাগর

দক্ষিণ চীন সাগর নামটি মূলত ইংলিশদের দেয়া। ঔপনিবেশবাদের সূচনার দিকে ইউরোপীয় বনিকরা এই সাগরকে ব্যবহার করতো ইউরোপ ও দক্ষিণ এশিয়া থেকে চীনের সাথে বাণিজ্য যোগযোগের জন্য। ষষ্ঠদশ শতাব্দীতে পর্তুগিজ বনিকরা এই সাগরকে মারে দে চায়না নামে ডাকতো। অফিশিয়ালি ইন্টারন্যাশনাল হাইড্রোকার্বন অর্গানাইজেশন প্রথম সাউথ চায়না সি ‍South China Sea নামটি ব্যবহার করতে শুরু করে। আর এর চীনা নাম নানফাং হাই, যেটি ঝৌ সম্রাজ্যের উপাখ্যানে প্রথম পাওয়া যায়। নানফাং হাই বলতে বোঝায় দক্ষিণের সাগর। চীনা ভূখণ্ডের দক্ষিণ দিকে অবস্থানের কারণেই এই নাম দেয়া হয়।

দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে বিরোধ

তবে এই সাগরের মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকার কারণে এর নাম নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। ২০১১ সালে স্প্রাটলি দ্বীপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে বিরোধের পর ফিলিপাইন সরকারের অনেক প্রতিষ্ঠান এই সাগরকে পশ্চিম ফিলিপাইন সাগর নামে অভিহীত করতে শুরু করে। ২০১২ সালে ফিলিপাইন সরকার এই নামটি ঘোষণা করে একটি নির্দেশ জারি করে। ফিলিপাইন উপকূলের আশপাশের অর্থনৈতিক জোনগুলোকে নিয়ে এই নাম চালু করে দেশটি। ২০১৭ সালে ইন্দোনেশিয়া তার দাবিকৃত এলাকার নাম দেয় নর্থ নাতুনা সি। দেশটির নাতুনা দ্বীপের উত্তর দিকের সাগরকে এই নাম দেয়া হয়।

এই সাগরের মাঝে আছে অনেকগুলো দ্বীপ ও দ্বীপপুঞ্চ। এর মধ্যে স্প্রাটলি দ্বীপপুঞ্জ, প্যারাসেল দ্বীপপুঞ্জ, প্রাটাস দ্বীপ, ম্যাকলেসফিল্ড ব্যাংক, স্ক্রারবরো শোল ইত্যাদি। স্প্রাটলি দ্বীপপুঞ্জে আছে বিভিন্ন আকারের ৮১০টি দ্বীপ, যা বিস্তৃত ৯০০ কিলোমিটার পর্যন্ত। সব মিলে অন্তত ২৫০টি ছোট-বড় দ্বীপ, অটল ,রিফ, স্যান্ডবার রয়েছে এই সাগরে।

দক্ষিণ চীন সাগর সংকট

দক্ষিণ চীন সাগরের অর্থনৈতিক- বিশেষ করে বাণিজ্যিক গুরুত্ব অপরসীম। সমুদ্র পথে পরিচালিত বিশ্ব বাণিজ্যের এক তৃতীয়াংশ যায় এই সাগরের ওপর দিয়ে। প্রতি বছর যা দাড়ায় ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি। আর এই সাগরের তলদেশে প্রচুর পরিমাণে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ রয়েছে। এখানে অপরিশোধিত তেলের পরিমান ১১ বিলিয়ন ব্যারেল বলে গবেষকদের ধারণা।

এছাড়া ১৯০ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফুট প্রাকৃতিক গ্যাস রয়েছে। এছাড়া এই সাগরের মৎস সম্পদ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনীতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সারা বিশ্বে যত মাছ ধরার নৌকা বা জাহাজ রয়েছে, তার অর্ধেকই ভাসে এই সাগরের পানিতে। যার ফলে কয়েক মিলিয়ন মানুষের জীবিকা নির্ভর করে দক্ষিণ চীন সাগরের ওপর।

যে কারণে এই সাগরের মালিকানা নিয়ে এর উপকূলবর্তী দেশগুলোর মধ্যে বিরোধীতা জোরদার হয়েছে। চীন এই সাগরের সিংহভাগ নিজের বলে দাবি করে আসছে, যদিও অন্য দেশগুলোও নিজ নিজ দাবি ছাড়তে নারাজ। ব্রুনাই, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান ও ভিয়েতনাম এই সাগরের বিভিন্ন অংশের মালিকানা দাবি করে আসছে।

বিরোধের ইতিহাস

এই সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধীতার ইতিহাস অনেক পুরনো। ১৯৭০ এর দশকের শুরুর দিকে বিভিন্ন দেশ এই সাগরের বিভিন্ন দ্বীপের মালিকানা দাবি করতে শুরু করে। বিশেষ করে প্রাকৃতিক সম্পদ ও মৎস অঞ্চল হিসেবে বিখ্যাত স্প্রাটলি দ্বীপ নিজেদের বলে দাবি করে কয়েকটি দেশ। অন্য দিকে চীন এই সমুদ্রসীমায় অন্যদের ঢুকতে দিচ্ছে না। তারা আন্তর্জাতিক আইনের বরাত দিয়ে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক জোনে গোয়েন্দা তৎপরতা, অনুসন্ধান ও নজরদারি কার্যক্রমে বাধা দেয়।

যদিও যুক্তরাষ্ট্র বলছে, জাতিসঙ্ঘের সমুদ্র বিষয়ক কনভেনশন অনুযায়ী মালিকানা দাবি করা সবগুলো দেশকে এই সমুদ্রসীমায় বিনা বাধায় চলাচল করতে দেয়া উচিত। ২০১৬ সালে নেদারল্যান্ডের হেগ শহরের আন্তর্জাতিক শালিস আদালত ফিলিপাইনের দায়ের করা এক মামলায় চীনের এই খামখেয়ালির বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে। তবে চীন এই রায় গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্যাটেলাইটের ছবিতে দেখা গেছে, চীন এই সাগরের বিভিন্ন অঞ্চলে তৎপরতা চালাচ্ছে। নতুন কিছু দ্বীপে তারা সামরিক স্থাপনা নির্মাণ করেছে, আবার কিছু কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করেছে সাগরের বুকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ চীন সাগরের প্যারাসেল ও স্প্রাটলি দ্বীপে চীন সমুদ্র বন্দর, সামরিক স্থাপনা ও বিমান ঘাঁটি নির্মাণ করেছে। এই দুটি দ্বীপে চীনের রয়েছে অন্তত ২৭টি ছোট আকারের সামরিক পোস্ট। আর উডি দ্বীপে চীন মোতায়েন রেখেছে ফাইটার জেট, ক্রুজ মিসাইল। স্থাপন করেছে অত্যাধুনিক রাডার সিস্টেম।

চীনের সামরিক তৎপরতা

চীনের এই সামরিকায়নের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন বলছে, এশিয়া অঞ্চলে তাদের মিত্র দেশগুলোর জন্য দক্ষিণ চীন সাগরের সামরিকায়ন হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। এছাড়া বিতর্কীত সমুদ্রসীমায় চীনা উপস্থিতি নিয়েও আপত্তি তুলেছে মার্কিন সেনা কর্মকর্তারা। এসব সমুদ্রসীমায় উপস্থিতি জোরদার করতে ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনের কাছে যুদ্ধজাহাজ ও সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করেছে জাপান।

এসব দেশগুলোর সবারই আশঙ্কার বিষয় চীনা আধিপত্য রোধ করা, সেই সাথে বেইজিংয়ের সামরিক হুমকিতেও রয়েছে দেশগুলো। আর এই সঙ্কটে ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। মিত্র দেশ ছাড়াও তাদের সরাসরি বাণিজ্যিক ও কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে এই সমুদ্রসীমায়।

ফিলিপাইনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক চুক্তি রয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগরে ফিলিপাইন তেল-গ্যাস অনুসন্ধান শুরু করলে চীন তাতে বাধা দিতে পারে। যে কারণে এসব নিয়ে চীন-ফিলিপাইন সঙ্ঘাত শুরু হলে তাতে জড়িয়ে পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্র। আবার তাইওয়ান প্রণালীতেও যুক্তরাষ্ট্র প্রায়ই যুদ্ধাজাহাজ পাঠায়, যাকে চীন তার স্বার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে মনে করে।

দক্ষিণ চীন সাগরের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব

অর্থনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি এই সাগর নিয়ে লড়াইয়ের আরেকটি কারণ এর অবস্থান। দক্ষিণ চীন সাগরের অবস্থান এমন একটি জায়গায় যার চারদিকেই আছে এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সব দেশ। আবার এই সাগর থেকে খুব সহজেই প্রশান্ত মহাসাগরে মুভ করা যায়। এখান থেকে মালাক্কা প্রণালী কিংবা জাভা সাগর হয়ে যাওয়া যায় ভারত মহাসাগরে। বঙ্গোপসাগর কিংবা আরব সাগরও খুব বেশি দূরে নয়।

তাই দক্ষিণ চীন সাগরে যে কোন সামরিক স্থাপনা থেকে যেমন খুব সহজেই যে কোন সাগরে যাওয়া যায় তেমনি এখান থেকে এশিয়ার মূল ভূখ- কিংবা দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর ওপর নজরদারি করা সহজ। যে কারণে এই সাগরকে নিজের কব্জায় রাখতে বেইজিং যেমন নাছোরবান্দা, তেমনি ওয়াশিংটনও এখানে নিজেদের স্বার্থ খুজে পেয়েছে।

টোকিও ভিত্তিক সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো বোনজি ওহারা মনে করেন প্রধানত তিনটি কারণে চীন এই সাগরের ৯০ শতাংশের মালিকানা নিজের দখলে রাখতে মরিয়া। তিনি বলেন, প্রথমত দক্ষিণ চীন সাগর চীনা নৌ বাহিনীর নিউক্লিয়ার ব্যালেস্টিক মিসাইল সাবমেরিনের একটি পেট্রোল রুট। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পারমাণবিক লড়াইয়ে টিকে থাকার জন্য এসব সাবমেরিনকে এখান থেকে যেতে হয় প্রশান্ত মহাসাগরে। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র যদি কখনো চীনের মূল ভূখণ্ডে হামলা চালায়, তাহলে এই সাগরটি একটি বাফার জোন হিসেবে কাজ করবে। এছাড়া অর্থনৈতিক গুরুত্ব তো রয়েছেই।

এই জাপানি গবেষক মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যদি কখনো চীনকে প্রশান্ত মহাসাগর ও ভারত মহাসাগরে প্রবেশের অন্য রুটগুলোতে বাধা দিতে চেষ্টা করে, তাহলে চীন এই সাগরটি ব্যবহার করতে পারবে।
এই অঞ্চলে চীনকে মোকাবেলা করতে যুক্তরাষ্ট্র এই সাগরের উপকূল নেই এমন কিছু দেশকেও ডেকে আনছে।

অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও ভারতকে নিয়ে তারা কোয়াডরিলাটেরাল সিকিউরিটি ডায়লগ নামের একটি অনানুষ্ঠানিক কৌশলগত জোট গঠন করেছে। যারা বিভিন্ন সময় সামরিক মহড়াও আয়োজন করছে। তবে কোন কিছুই এখন পর্যন্ত চীনকে টলাতে পারেনি। তারা দক্ষিণ চীন সাগরে ক্রমাগত সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক তৎপরতা জোরদার করে চলেছে। বেইজিং সব সময় বলছে, এই সাগর চীনের এবং সেটি তারা কাউকে দেবে না।

লেখকের ফেসবুক পেজে যুক্ত হতে লাইক দিন : আহমেদ

২৯-০৮-২০২১

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top