russia pakistan

রাশিয়া পাকিস্তান বন্ধুত্ব হয় না কেন

পাকিস্তানের ও রাশিয়ার সম্পর্ককে সহজ কথায় বর্ণনা করা কঠিন। দেশ দুটির সম্পর্ক কখনোই এক ধারায় চলেনি। তবে এটা বলা যায় যে, পাকিস্তান ও রাশিয়া কখনোই বন্ধু রাষ্ট্র ছিলো না। বিভিন্ন সময়ে এই সম্পর্ক ভালো, মন্দ দুদিকেই গড়িয়েছে; কিন্তু কখনোই বন্ধুত্বের পর্যায়ে পৌছেনি। এক দিকে মুসলিম প্রধান পাকিস্তান, অন্য দিকে কমিউনিস্ট শাসনের রাশিয়া। দুটি দেশের নাগরিকরাও তাই একে অন্যের প্রতি খুব একটা টান অনুভব করেনি কখনো। আবার বিভিন্ন সময় এই সম্পর্কে বাধা হয়ে দাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়া পাকিস্তান সম্পর্কের অতীত-বর্তমান নিয়ে এই প্রতিবেদন।

পাকিস্তান রাশিয়া সম্পর্ক

পাকিস্তান ও রাশিয়ার মধ্যকার সম্পর্কে সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত। নয়া দিল্লি ঐতিহাসিকভাবেই মস্কোর ঘনিষ্ঠ মিত্র। অন্য দিকে পাকিস্তানের সাথে সুসম্পর্ক ছিলো যুক্তরাষ্ট্রের। তাই মস্কো-ইসলামাবাদ সম্পর্ক কখনো খুব বেশি ঘনিষ্ঠ হতে পারেনি। ইতিহাসের বড় বড় কিছু ঘটনায় দুটি দেশ বরং একে অন্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের বিপক্ষে গিয়ে ভারতকে সমর্থন দিয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়ন, আবার আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সেনাদের তাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মিলে কাজ করেছে পাকিস্তান। স্নায়ুযুদ্ধের সময়ও পাকিস্তান পুরোপুরি ইউরোপ ঘেষা ছিলো।

নেহেরুর যুক্তরাষ্ট্র সফরে অসন্তুষ্ট হয় রাশিয়া, যেটি আশীর্বাদ হয়ে দেখা দেয় পাকিস্তানের জন্য

তবে পাকিস্তানের ক্ষমতার মসনদে পরিবর্তনের সাথে সাথে বিভিন্ন সময় এই ধারায় পরিবর্তন এসেছে। দেশটির অনেক শাসকই রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেছেন। ইতিহাস বলছে, পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক সরকারগুলো রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক স্থাপনে আন্তরিক ছিলো সব সময়। বিভিন্ন সময় পাকিস্তানে বড় বিনিয়োগও করেছে মস্কো। রাশিয়াও চেয়েছে পাকিস্তানের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপনে; কিন্তু যখনই পাকিস্তানে সামরিক সরকার ক্ষমতা দখল করেছে, পুরোপুরি পাল্টে গেছে ইসলামাবাদের পররাষ্ট্রনীতি। এর কারণ বেশিরভাগ সময়ই পাকিস্তানে সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছে মার্কিন পৃষ্ঠপোষকতায়। যে কারণে দেশটির সামরিক শাসকরা মস্কোর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে ওয়াশিংটনমুখী হয়েছে।

Russia Pakistan সম্পর্কের সূচনা

দুই ভূখণ্ডের মাঝে যোগাযোগের সূচনা সোভিয়েত ইউনিয়নে বলশেভিক বিপ্লবের পর। ১৯২২ সালের পর সোভিয়েত রাশিয়া থেকে ব্রিটিশ শাসনে থাকা পাকিস্তানে আসা কিছু লোক ব্রিটিশ বিরোধী কমিউনিস্ট বিপ্লবের চেষ্টা করেছিল বলে জানা যায়। আর তাতে সহযোগিতা ও ইন্ধন ছিলো সোভিয়েত ইউনিয়নের। ১৯৪৭ এ পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার মস্কোর সাথে পাকিস্তানের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়।

ইসলামাবাদ ভিত্তিক ইনস্টিটিউট অব স্ট্রাটেজিক স্ট্রাটেজিস এর তথ্য মতে, ব্রিটিশ ভারতের স্বাধীনতার সময় বাংলা ও পাঞ্জাবের বিভক্তি সমর্থন করেনি রাশিয়া। তারা এর বিরোধীতা করতে থাকে এবং এর জন্য ব্রিটেনকে দায়ী করতে থাকে। মস্কো এই ভাগাভাগিকে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রনীতির ডিভাইড এন্ড রুল পদ্ধতির বাস্তবায়ন হিসেবে আখ্যায়িত করতে থাকে। যে কারণে জোসেফ স্টালিন কিংবা অন্য কোন কমিউনিস্ট নেতা নবগঠিত পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মাদ আলী জিন্নাহকে অভিনন্দন বার্তাও পাঠাননি। কাশ্মির ইস্যু নিয়ে জাতিসঙ্ঘে ভোটাভুটি হলে মস্কো সেখানে ভারতের পক্ষে ভোট দেয়।

১৯৪৮ সালে জিন্নাহর মৃত্যুর পর নবগঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রটি পুনর্গঠন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। তৎকালীন নেতারা অর্থনৈতিক সঙ্কট, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, পররাষ্ট্রনীতির চ্যালেঞ্জিং বিষয়গুলো সামলে উঠতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। ওই বছর জাতিসঙ্ঘের এক ফোরামে পাকিস্তান যে কোন রাষ্ট্র থেকে সহযোগিতা গ্রহণের আশা প্রকাশ করে; কিন্তু তাতে অনেক দেশ সাড়া দিলেও সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিলো চুপচাপ। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আরো কিছু উদ্যোগ নেয়া হলেও তা সফল হয়নি। বরং সেসময় মস্কো ভারতের সাথে সুসম্পর্ক রক্ষায় বেশি আন্তরিক ছিলো।

পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের বাক বদল

তবে পরের বছর ভারতের কমনওয়েলথ জোটে যোগদান ও জওয়াহের লাল নেহেরুর যুক্তরাষ্ট্র সফরে অসন্তুষ্ট হয় রাশিয়া, যেটি আশীর্বাদ হয়ে দেখা দেয় পাকিস্তানের জন্য। নেহেরুর যুক্তরাষ্ট্র সফরে ক্ষুব্ধ হয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আল খানকে আমন্ত্রণ জানায় মস্কো। সে সময়ের পরিরস্থিতি নিয়ে পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই রাষ্ট্রের সম্পর্ক স্থাপনের লক্ষ্য ছিলো শুধুই অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহযোগিতা বিনিময়।

ইসলামিক ব্যাকগ্রাউন্ডের পাকিস্তানের সাথে নাস্তিক্যবাদী মার্কসবাদের দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা আছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন তার মিত্রদের কিভাবে অনুগত করে রাখে সেটিও পাকিস্তানের অজানা নয়। তবু পাকিস্তানের জন্য জরুরী দরকারি সামগ্রী ও কারিগরি সহযোগিতা সোভিয়েত ইউনিয়ন দিতে পারবে কি না সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

তবে বছর কয়েক পরেই এই সম্পর্ক স্থাপন আবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে লিয়াকত আলী খানের বিরুদ্ধে কমিউনিস্টদের অভ্যুত্থান চেষ্টা, পাকিস্তানের সাউথইস্ট এশিয়ান ট্রিটি অর্গানাইজেশনে যোগদানসহ বিভিন্ন কারণে। আইয়ুব খান ক্ষমতায় এসেই যুক্তরাষ্ট্র ও মস্কো উভয় পক্ষের সাথে সম্পর্ক রক্ষার চেষ্টা করলেও সেটি ফলপ্রসূ হয়নি।

এর মধ্যে ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে ভারতের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী হয়ে ওঠে সোভিয়েত ইউনিয়ন। যেটি পাকিস্তানকে বাধ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে পড়তে। পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞাও দেয়া হয় সোভিয়েত ইউনিয়নের তৎপরতায়।

হয়তো একই কারণে ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধেও বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেয় মস্কো। ওই বছর ৬ ডিসেম্বর রাশিয়ার ভ্লাদিভোস্তক থেকে পারমাণবিক সাবমেরিন, ক্রুজার ও ডেস্ট্রয়ারের দুটি নৌ বহর যাত্রা করে ভারত মহাসাগরের উদ্দেশ্যে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পক্ষে নৌ বহর পাঠালে, সোভিয়েত ইউনিয়ন পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে এই পদক্ষেপ নেয়। পারমাণবিক সাবমেরিনের উপস্থিতি পাকিস্তানের জন্য বড় হুমকি হয়ে দেখা দেয়।

২০১২ সালে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে করাচিতে নিযুক্ত রুশ কনস্যুলেট জেনারেল স্বীকার করেন যে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে সোভিয়েত ইউনিয়নের অবস্থান দুই দেশের সম্পর্ক খারাপ করতে ভুমিকা রেখেছে।

ভুট্টোর পররাষ্ট্র নীতির সুফল

সম্পর্কের এই ধারা পরিবর্তনে সবচেয়ে কার্যকর ভুমিকা রেখেছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতিতে আমূল পরিবর্তন এনে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঘনিষ্ঠতা কমিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে সম্পর্ক জোরদার করতে শুরু করেন।

পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি মস্কো সফরও করেন। ওই সফরে দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার সম্পর্কের সূত্রপাত হয়। শুরু হয় বিভিন্ন সেক্টরে সহযোগিতার সম্পর্ক। যার ধারাবাহিকতায় ১৯৭৩ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থায়নে গড়ে ওঠে পাকিস্তান স্টিল মিলের মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠান। বিশাল এই প্রকল্পে কারিগরি সহায়তাও দেয় মস্কো; কিন্তু ১৯৭৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে এক সামরিক অভ্যুত্থানে ভুট্টোকে ক্ষমতাচ্যুত করেন জেনারেল জিয়া উল হক। এরপর থেকেই আবার পাল্টে যায় মস্কো-ইসলামাবাদের সম্পর্ক।

এর কিছুদিন পর সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানের সেনা পাঠালে, জেনারেল জিয়ার সরকার তার সেনাকর্মকর্তাদের সোভিয়েত বিরোধী তৎপরতার নির্দেশ দেন। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ ও অস্ত্র তারা পৌছে দিতে শুরু করে আফগান যোদ্ধাদের। সরাসরি তদের প্রশিক্ষণও দেয় পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা। মূলত আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের পরাজয়ের অন্যতম উপলক্ষ ছিলো পাকিস্তান।

অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ১৯৭১ সালের যুদ্ধে ভারতকে সমর্থন দেয়ার প্রতিশোধ হিসেবেই পাকিস্তান সোভিয়েত বিরোধী মুজাহিদীনদের পক্ষে অবস্থান নেয়। এবং শেষ পর্যন্ত তাদের আফগানিস্তান ছাড়তে বাধ্য করে।

নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে এসে আবার সম্পর্ক উন্নত হতে শুরু করে। ওই সময় পাকিস্তানে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব দেয় মস্কো, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের বাধার কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। পরবর্তীতে বেনজির ভুট্টো, নওয়াজ শরীফ ও পারভেজ মোশাররাফের সময়ও দুই পক্ষের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিলো। ২০০৭ সালের পর থেকে পাকিস্তানের সাথে ওয়াশিংটনের দূরত্ব বাড়তে থাকলে, পাকিস্তান-রাশিয়া সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করে। পাকিস্তানের ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলারও নিন্দা জানায় রাশিয়া।

পুতিন যুগে পকিস্তান-রাশিয়া সম্পর্ক

২০১১ সালে ভ্লাদিমির পুতিন স্বীকার করেন যে, দক্ষিণ এশিয়া ও মুসলিম বিশ্বে রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার পাকিস্তান।  ২০২১ সালে পাকিস্তানকে এমআই-৩৫ অ্যাটাক হেলিকপ্টারের একটি চালান সরবরাহ করে রাশিয়া। এছাড়া এন্টি ট্যাংক ওয়েপন্স, এয়ারডিফেন্স সিস্টেম ও ছোট অস্ত্রের বেশ কয়েকটি চুক্তি হয় দুই পক্ষের মাঝে।

২০২১ সালের এপ্রিলে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ ইসলামাবাদ সফর করেন। যেটি ছিলো ৯ বছর পর কোন রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পাকিস্তান সফর। ওই সফরে তিনি পাকিস্তানকে অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করার অঙ্গীকার করেন। এছাড়া পাকিস্তানে আড়াই বিলিয়ন ডলারের একটি গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ করার চুক্তি করেছে রাশিয়া। করাচি থেকে পাঞ্জাব পর্যন্ত ওই পাইপলাইনের দৈর্ঘ ১১০০ কিলোমিটার। আবার পাকিস্তানের প্রাকৃতি গ্যাস উত্তোলনেও সহযোগিতা করবে রাশিয়া।

একই বছর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সাথে বেশ কয়েক দফা টেলিফোন আলাপ করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এসব কারণে বিশ্লেষকরা ধারণা করেছিলেন, পাকিস্তান ও রাশিয়ার মধ্যে গত কয়েক দশকের শীতল সম্পর্ক এবার উষ্ণতায় রূপ নিতে যাচ্ছে।

তবে ২০২২ সালে আবারো এই সম্পর্কে বাগড়া দেয় যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়ার সাথে ঘনিষ্ঠ হতে চাওয়ায় ক্ষমতা হারাতে হয় ইমরান খানকে।

লেখকের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন : আহমেদ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top