গুপ্তচরবৃত্তি বিশ্ব রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য এক অংশ। অন্য দেশ থেকে গোপনে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে চলে এই কার্যক্রম। নানান পেশার ছদ্মবেশে গুপ্তচরেরা অন্য দেশে গিয়ে কাজ করে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে কূটনীতিকের কাভারে গুপ্তচরবৃত্তি। একটি দেশের প্রতিনিধি হয়ে অন্য দেশে দায়িত্ব পালন যারা করেন, সেই কূটনীতিকদের দায়িত্ব ও মর্যাদা খুবই উচুতে; কিন্তু এই সম্মানজনক পেশাটির আড়ালেও চলে গুপ্তচরবৃত্তি। বিষয়টি অনেকটাই ওপেন সিক্রেট। বেশির ভাগ সময়ে দেখেও না দেখার ভান করা হয়। কূটনীতির আড়ালে গুপ্তচরবৃত্তির নানা দিক নিয়ে এই লেখা।
বিভিন্ন সময় বৈরী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনার সময় আমরা প্রায়ই শুনি কূটনীতিক বহিষ্কারের কথা। এক বা একাধিক, কখনো বা ডজনেরও বেশি কূটনীতিককে বহিষ্কার করা হয়। আর যাদের বহিষ্কার করা হয়, তাদের সবার বিরুদ্ধে একটাই অভিযোগ ওঠে সেটা হলো- কূটনীতির কাভার নিয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করা। অর্থাৎ কূটনীতিক হিসেবে দূতাবাসে পোস্টিং হলেও তারা কূটনীতক নন, মূলত গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট হিসেবে গিয়েছেন ওই দেশে।
সাধারণত অন্য দেশের দূতাবাসে যেসব কূটনীতিকদের নিয়োগ দেয়া হয় তাদের কাজ হলো ওই দেশের সাথে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আনুষ্ঠানিকতা রক্ষা করা। যেমন ওয়াশিংটনের বাংলাদেশ দূতাবাসে যেসব কূটনীতিকদের দায়িত্ব পালন করতে পাঠানো হয়, তাদের কাজ হলো যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ঠিক রাখা, এ বিষয়ক দাফতরিক কার্যক্রমে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করা, প্রবাসী বাংলাদেশীদের সুবিধ-অসুবিধা দেখা এবং যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়ী স্বার্থ অর্জনে সহযোগিতা দেয়া।
গুপ্তচর কারা
এমনিভাবে প্রতিটি দেশই অন্য দেশে নিজস্ব দূতাবাসে কূটনীতিকদের পাঠায়; কিন্তু প্রশ্ন আসতে পারে, তারা তো সবাই পেশাদার কূটনীতিক- তাহলে গুপ্তচর বৃত্তির অভিযোগে কেন বহিষ্কার করা হয়?
এই প্রশ্নের উত্তরের মাঝেই লুকিয়ে আছে বিশ্ব রাজনীতির বহুল প্রচলিত এক ওপেন সিক্রেট। বলা হয়ে থাকে প্রায় সব দেশই অন্য রাষ্ট্রে স্থাপিত দূতাবাসে কূটনীতিক পরিচয়ে সিক্রেট এজেন্ট পাঠায়। যদিও এটা তারা প্রকাশ্যে স্বীকার করে না। ব্রিটেনের ইউনিভার্সিটি অব বাকিংহামের সেন্টার ফল সিকিউরিটি এন্ড ইন্টেলিজেন্সের ডিরেক্টর প্রোফেসর অ্যান্থনি গ্লিস বিবিসিকে বলেন, বিশ্বের প্রতিটি দূতাবাসেই গুপ্তচর রয়েছে।
তার মতে, এ বিষয়ে দেশগুলোর মাঝে একটি অলিখিত সমঝোতা রয়েছে। যে দেশে কূটনীতিকের বেশে গুপ্তচর পাঠানো হয়, সেই দেশ ঠিকই বিষয়টি টের পায়; কিন্তু তারা দেখেও না দেখার ভান করে থাকে। এটি একটি রীতি হয়ে গেছে।
এসব কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট দেশে নিজেদের এজেন্ট তৈরি করে এবং তাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে। আর এজেন্টদের কাছ থেকে নিজ দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করে তা দেশে পাঠায়। এসব এজেন্টদের কখনো প্রলোভন দেখিয়ে, কখনো ব্ল্যাকমেইলিং করে আবার কখনো বা আদর্শগত কারণে রাজি করিয়ে কাজে লাগানো হয়।
যদি কখনো দুই দেশের মাঝে কূটনৈতিক উত্তেজনা দেখা দেয়, তাহলে সাধারণত বেছে বেছে এই গুপ্তচরদেরই বহিষ্কার করা হয়। খুব বেশি বড় অপরাধ না করলে প্রকৃত কূটনীতিকদের কখনো কোন দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয় না। যেমন ২০১৮ সালের মার্চ মাসে ব্রিটেন থেকে রাশিয়ার ২৩ কূটনীতিককে বহিষ্কার হয়। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নিজেই সরাসরি তাদের গুপ্তচর হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। আবার পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে রাশিয়াও ঠিক ২৩ ব্রিটিশ কূটনীতিককে বহিষ্কার করেছিল।
এরপর ইউক্রেন যুদ্ধের সময় আমরা দেখেছি রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর মাঝে এই বহিষ্কারের খেলা। উভয় পক্ষ কয়েকশো দূতাবাসকে বহিষ্কার করেছে যুদ্ধের আগে কিংবা যুদ্ধ শুরুর পর।
গুপ্তচরবৃত্তি কি
গুপ্তচর বৃত্তির এই ইদুর বিড়াল খেলা বিশ্ব রাজনীতিতে বহুকাল ধরেই চলে আসছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিশ্বব্যাপী গুপ্তচরবৃত্তি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময় মধ্যপ্রাচ্য থেকে, এশিয়া হয়ে ইউরোপ- সব দেশের রাজধানীতেই শত শত গুপ্তচর সক্রিয় ছিলো। তারা কখানো ড্যান্সার, যৌনকর্মী, এনজিও কর্মী কিংবা অন্য কোন পেশার আড়ালে এই কাজ করতেন।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাষ্ট্রগুলোর মাঝে এই প্রবণতা কমে এলেও কূটনীতির আড়ালে গুপ্তচরবৃত্তি বাড়তে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ফরেন সার্ভিসের প্রোফেসর অ্যাঞ্জেলা স্টেন্ট বলেন, এখন এসপিওনাজের প্রবণতা আবার বাড়ছে, যদিও তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়কে ছাড়িয়ে যায়নি। বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যেও সন্দেহ প্রবণতা বাড়ছে, যে কারণে তারা পরস্পরের বিরুদ্ধে তথ্য সংগ্রহে আশ্রয় নিচ্ছে কূটনীতির ছদ্মবরণের।
২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন যখন ৬০ রুশ কূটনীতিককে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করে, ওই সময়ের এক রিপোর্টে বলা হয় যে- দেশটিতে আরো অন্তত ৪০ জন রুশ গুপ্তচর কূটনীতিকের ছদ্মবেশে কাজ করছে দূতাবাস ও কনস্যুলেটে।
দূতাবাসে গুপ্তচরবৃত্তি
মার্কিন সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ও ওয়াশিংটনের ইন্টারন্যাশনাল স্পাই মিউজিয়ামের ডিরেক্টর ক্রিস্টোফার কস্টা বলেন, দূতাবাস ও অন্যান্য কূটনৈতিক মিশনে শত শত বছর ধরেই গুপ্তচরবৃত্তি চলে আসছে। বিশেষ করে শত্রু দেশের ভূখণ্ডে সবাই এটি করে। তিনি বলেন, যে দেশে এই গুপ্তচরদের পাঠানো হয়, সেই দেশ তাদের চিহ্নিত করতে পারলেও বেশির সময় তা প্রকাশ না করে তাদের ওপর কড়া নজর রাখে। এসপিওনাজ ও কাউন্টার এসিপিওনাজের এই খেলা সব দেশেই কমবেশি চলে বলে তার মত।
২০১৬ সালেও যুক্তরাষ্ট্রের বারাক ওবামা প্রশাসন ৩৫ রুশ কূটনীতিককে বহিষ্কার করেছিলো, পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে রাশিয়াও সমান সংখ্যক মার্কিন কূটনীতিককে বহিষ্কার করে। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপির এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, যখন কোন দেশ তার বন্ধু দেশে কূটনৈতিক মিশনের আড়ালে গুপ্তচর পাঠায়, তখন সংশ্লিষ্টকে দেশকে জানানো হয় তাদের সম্পর্কে। কূটনীতিকের ছদ্মবেশে যাওয়া ওই কর্মকর্তারা সবার কাছে কূটনীতিক হিসেবেই নিজেদের পরিচয় দেন; কিন্তু আড়ালে তারা ওই দেশের গোয়েন্দা সংস্থার সাথে লিয়াজোর কাজ করেন।
আর শত্রু দেশে এ ধরণের কর্মকর্তাদের পাঠানো হয় গোপনে। যদিও শেষ পর্যন্ত তা আর গোপন থাকে না। কারণ সব দেশই নতুন আসা যে কোন কূটনীতিকের সম্পর্কে ভালোভাবে খোঁজখবর নিয়ে থাকে। যেমন মস্কো যখন ওয়াশিংটনে কোন নতুন কূটনীতিককে পাঠায় তখন এফবিআইসহ মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তার সম্পর্কে ভালো করে খোঁজখবর নেয়। ওই কর্মকর্তাদের অতীত অনুসন্ধান করলে অনেক সময় তা দ্রুতই জানা যায়। ইন্টারনেটের দুনিয়ায় সেটি আরো সহজ এখন।
গুপ্তচরবৃত্তির উপাখ্যান
তবে যদি অনেক বছর ধরে প্রস্তুতি নিয়ে কোন গুপ্তচরকে কূটনীতিক সাজানো হয়, সেক্ষেত্রে তা সহজে ধরা পড়ে না। কারণ সেক্ষেত্রে শুরু থেকেই পরিকল্পনামাফিক কূটনীতিক হিসেবে হিসেবে পরিচয় গড়ে তোলা হয়।
সাধারণত দূতাবাসগুলোতে নিরাপত্তা কর্মকর্তা, রাজনৈতিক কর্মকর্তা, যোগাযোগ বিশেষজ্ঞের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে গুপ্তচরদের বসানো হয়। খুব উচ্চপর্যায়ের কারিগির প্রশিক্ষণ দেয়া হয় তাদের। সংশ্লিষ্ট দেশের কর্মকর্তাদের টেলিফোনে আড়ি পাতাসহ যান্ত্রিক যোগাযোগের ওপর দক্ষ হয়ে থাকেন তারা।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নিজেও এক সময় কূটনীতিকের কাভারে গুপ্তচরবৃত্তি করতেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের দুর্ধর্ষ গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবির হয়ে ১৯৮৫ থেকে ’৯০ সাল পর্যন্ত পূর্ব জার্মানিতে কাজ করেছেন তিনি। কাগজে কলমে ড্রেসডেনের সোভিয়েত দূতাবাসে একজন অনুবাদক হিসেবে কাজ করতেন পুতিন; কিন্তু এর আড়ালে দেশটিতে তিনি চালাতেন গুপ্তচরবৃত্তি। বার্লিন দেয়ালের পতনের পর শেষ মূহুর্তে পুতিন তার কাছে সংরক্ষিত কেজিবির সব ডকুমেন্ট পুরিয়ে দিতে পেরেছিলেন বলে ধরা পড়তে পড়তেও বেঁচে গিয়েছিলেন।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে যদি একজন ছদ্মবেশী গুপ্তচরকে চিহ্নিত করা না যায় তাহলে কিভাবে তাকে ধরা যাবে এমন প্রশ্নের উত্তরে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সির অ্যানালিস্ট জন শিল্ডলার বলেন, এমন কর্মকর্তাদের ধরার উপায় হলো, তারা কার কার সাথে গোপন বৈঠক করে এবং আমাদের নজরদারি এড়ানোর কোন চেষ্টা করে কি না তা খেয়াল করা।
আরো পড়ুন :
যুক্তরাষ্ট্র সব সময়ই বলে তারা কূটনৈতিক ছদ্মবরনে গুপ্তচরবৃত্তি করে না। তবে ২০১৭ সালে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাকারোভা অভিযোগ করে বলেন, সিআইএ ও পেন্টাগনের এসপিওনাজ ইউনিটের অনেক কর্মী আমেরিকার কূটনৈতিক মিশনের আড়াল নিয়ে রাশিয়ায় কাজ করছে। রুশ মুখপাত্রের এই কথার সত্যতা মেলে মধ্যপ্রাচ্যে নিযুক্ত সিআইয়ের সাবেক ফিল্ড অফিসার রবার্ট বায়েরের কথায়।
তিনি বলেন, বিদেশে মার্কিন দূতাবাসগুলোতে পলিটিক্যাল সেকশনের পাশেই থাকে সিআইয়ের স্টেশন। কূটনীতিকরা সিআইয়েকে খুশি মনে সহযোগিতা করেন, এমনকি রাষ্ট্রদূতরাও গুপ্তচরদের পছন্দ করেন।
ফেসবুক পেজে যুক্ত হতে লাইক দিন : আহমেদ


