মঈন আলী wife

ক্রিকেট ছাড়ার পর মুয়াজ্জিন হতে চান মঈন আলী

ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলের নিয়মিত মুখ মঈন আলী। ক্রিকেটের সব ফরম্যাটেই দারুণ পারফর্ম করছেন জাতীয় দলের হয়ে। দলের হয়ে জিতেছেন বিশ্বকাপ। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাইরে ফ্রাঞ্চাইজি লিগেও বেশ কদর এই অলরাউন্ডারের। ক্রিকেটের বাইরেও তার রয়েছে বিশাল এক জগত, যেখানে মঈন আলী ধার্মিক ও মানবিক। যার মন কাঁদে অসহায় মানুষের জন্য।

ইংলিশ ক্রিকেটার মঈন আলীর জীবনের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করবো আজ।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মঈন আলীর শুরুটা ছিলো সাদামাটা। অবশ্য যতই সময় গড়িয়েছে নিজের অবস্থান ততই জোড়ালো করেছেন। ইংল্যান্ডের হয়ে ওয়ানডে বিশ্বকাপও জিতেছেন। ডানহাতি অফস্পিন বোলিং আর বামহাতে মিডল অর্ডারে ব্যাটিং করে থাকেন তিনি। গ্রায়েম সোয়ানের আচমকা অবসরের পর একজন অফস্পিনার খুজছিলো ইংল্যান্ড দল।

সেই সুযোগটাই আসে মঈন আলীর সামনে। পাশাপাশি ব্যাট হাতেও দক্ষতা থাকায় তার ওপর ভরসা রাখে ইংল্যান্ড টিম ম্যানেজমেন্ট। ঢাকায় অনুষ্ঠিত ২০১৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের জন্য ঘোষিত দলে জায়গা হয় তার। তবে বিশ্বকাপের আগেই ইংল্যান্ড দল ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর করলে সেখানেই ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি অভিষেক হয় তার।

মঈন আলী ক্রিকেটার

আলোচনায় আসার মতো কিছু না করলেও সব ম্যাচেই দলের হয়ে কম-বেশি ভূমিকা রেখেছেন। যে কারণে ওই বছর জুন মাসে দেশের মাটিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজের দলে জায়গা হয় তার। টেস্ট অভিষেক হয় ক্রিকেটের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী ভেন্যু লর্ডসে। ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় টেস্টে খেলেন দুর্দান্ত এক ইনিংস।

লিডস টেস্টের শেষ দিনে ম্যাচ বাঁচাতে ইংল্যান্ডের দরকার ছিলো ৫ উইকেট নিয়ে পুরো দিন ব্যাটিং করা। ব্যাট হাতে একাই প্রতিরোধ গড়েন তরুণ মঈন আলী; কিন্তু দিনের শেষ ওভারে জেমস অ্যান্ডারসন আউট হয়ে যাওয়ায় ব্যর্থ হয় তার লড়াই। ১০৮ রানে অপরাজিত থেকেও পরাজয় সঙ্গী করে ড্রেসিং রুমে ফিরতে হয়েছে তাকে।

পরের মাসে ভারতের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজটাও দারুণ কাটে তার। এরপর থেকেই কখনো ব্যাট হাতে, কখনো বল হাতে পারফর্ম করে গেছেন। ক্রমশ উন্নতি হয়েছে পারফরম্যান্সের গ্রাফ। পাকিস্তানের সাবেক অফস্পিনার সাইদ আজমলের কাছ থেকে দুসরা আয়ত্ব করার পর তার বলে ধার আরো বেড়ে যায়।

২০১৭ ওভাল টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে করেছেন হ্যাটট্রিক। ব্যাট হাতেও পেয়েছেন বেশ কয়েকটি সেঞ্চুরি। পরের বছরই ইংল্যান্ডের হয়ে বিশ্বকাপ ও অ্যাশেজ সিরিজ খেলেছেন। তবে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জনটি তার এসেছে ২০১৯ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে।

মঈন আলীর ক্যারিয়ার

৬১ টেস্টে ৫ সেঞ্চুরিতে ২ হাজার ৮৩১ রানের পাশাপাশি উইকেট নিয়েছেন ১৮৯টি। আর ১০৯ ওয়ানডেতে রান প্রায় ২ হাজার, সেঞ্চুরি আছে ৩টি। ওয়ানডেতে উইকেট নিয়েছেন ৮৬টি। ইংল্যান্ড দলকে একটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে নেতৃত্বও দিয়েছেন মঈন আলী। এর আগে অনূর্ধ-১৯ দলকে নেতৃত্ব দেয়ার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। তাই ভবিষ্যতে ইংলিশদের নেতৃত্ব তার কাঁধে উঠলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শুরুটা ধীর গতিতে হলেও ঘরোয়া মঈন আলীর উত্থানটা ছিলো চমক জাগানিয়া। ২০০১ সালে স্থানীয় অনূর্ধ-১৫ পর্যায়ের একটি ২০ ওভারের ম্যাচে খেলেছিলেন অপরাজিত ১৯৫ রানের ইনিংস। সেদিন তার বয়স ১৪ বছর হতে বাকি ছিলো ৩দিন। আরেকটি ম্যাচে ১১তম ওভারে যখন আউট হয়েছেন, তখন তার রান ছিলো ১৩০।

১৫ বছর বয়সে কাউন্টি দল ওয়ারউইকশায়ারে যখন ট্রায়াল দিতে যান এক দেখাতেই তাকে দলে নেয় ক্লাবটি এবং পূর্ণাঙ্গ চুক্তি করা হয় তার সাথে। ২০০৬ সালের যুব বিশ্বকাপে তার নেতৃত্বে সেমিফাইনালে ওঠে ইংল্যান্ড।  ২০০৭ সালে যোগ দেন আরেক কাউন্টিক্লাব ওরচেস্টারশায়ারে। দারুণ কয়েকটি মৌসুম কাটিয়েছেন ক্লাবটিতে।

প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ২০টি আর লিস্ট এ ক্রিকেটে রয়েছে ১১টি সেঞ্চুরি। দুই ফরম্যাটে উইকেট নিয়েছেন যথাক্রমে ৩৭৬টি ও ১৬৯টি। এর পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী ফ্রাঞ্চাইজি ক্রিকেটেও তার কদর রয়েছে। আইপিএলে তিন মৌসুম ব্যাঙ্গালুরুতে খেলে যোগ দিয়েছেন চেন্নাই সুপার কিংসে। পিএসএলে খেলছেন মুলতানের হয়ে। বাংলাদেশী অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানের সাথে বন্ধুত্বের সূত্র ধরে ঢাকার ঘরোয়া ক্রিকেটে মোহামেডান স্পোর্টি ক্লাবে খেলেছেন এক মৌসুম।

জন্ম ও বেড়ে ওঠা

১৯৮৭ সালে বার্মিংহামে পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত এক ব্রিটিশ পরিবারে জন্ম মঈন আলীর। তার আজাদ কাশ্মির থেকে ইংল্যান্ডে অভিবাসী হয়েছিলেন দাদা। বাবা মুনীর আলী ছিলেন সাইক্রিয়াটিক নার্স, কাজের ফাঁকে ট্যাক্সিও চালাতেন। সে সময় বার্মিংহাম আজকের মতো সমৃদ্ধ ছিলো না।

বাবার স্বল্প আয়ে কষ্টে-সৃষ্টে চলতো মঈনদের পরিবার। মঈন আলীর আরো দুই ভাই ও এক বোন রয়েছে। দুই ভাই কাদির ও ওমর খেলছেন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট। সংসারে অভাব থাকলেও তার বাবা ছেলেদের খেয়াল খুশির দিকে খুব নজর রাখতেন।

ছেলেরা ক্রিকেট পাগল এটা বুঝতে পেরে তিনি তাদের আর অন্য কিছু বানাতে জোর করেননি। ক্রিকেটার হতে যা প্রয়োজন সব করেছেন। একবার মঈন আলীকে নিয়ে গেছেন কাউন্টি দল সমারসেটে ট্রায়াল দিতে। ঘরে যা পয়সা ছিলো তা দিয়ে যাতায়াত খরচের পর দুজনের দুপুরের খাবার সম্ভব নয়।

মঈন আলীর জন্য একটি স্যান্ডউইচ কিনে দিয়ে বাবা মাঠের পাশে বসে ছিলেন। ইনিংস বিরতির সময় মঈন তার খাবার নিয়ে বাবার পাশে বসে দুজনে ভাগ করে খেয়েছেন একটি স্যান্ডউইচ।

এক সাক্ষাৎকারে মঈন আলী বলেছেন, ছোট বেলায় যাদের সাথে খেলেছি, তাদের মাঝে অনেকেই আমার চেয়ে ভালো খেলতো; কিন্তু আমি এমন একটি পরিবারে জন্মেছি বলেই হয়তো বিশ্বকাপ জয়ী দলের সদস্য হতে পেরেছি।

মুসলিম ক্রিকেটার মঈন আলী

বাবাই ছিলেন তার ক্রিকেটার হয়ে ওঠার সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক। ইংল্যান্ডের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা কবির আলী ছিলেন মঈন আলীদের চাচাতো ভাই। মহল্লার গলিতে কিংবা পাশ্ববর্তী পার্কে চাচাতো ভাইয়েরা মিলে ক্রিকেট খেলতেন। এখানেই টেপটেনিসে ক্রিকেট খেলার শুরু তার।

ইংল্যান্ডের মতো দলের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলছেন; কিন্তু মঈন আলী কখনোই তার নৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থান থেকে এতটুকু সড়ে আসেননি। ম্যাচ জেতার পর ইংলিশ রীতি অনুযায়ী সতীর্থরা যখন শ্যাম্পেন ছিটিয়ে উদযাপন করে, মঈন চুপচাপ নিজেকে সরিয়ে নেন সেসব থেকে।

ক্রিকইনফোকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আমার ধর্ম সব কিছুর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দল থেকে বাদ পড়ার ভয় কিংবা অবসরের পর কী করবো সেসব নিয়ে আমার মাঝে কোন চিন্তা নেই। আমি শুধু সেরা মানুষ হতে চাই। কতটি সেঞ্চুরি করলাম বা কতগুলো উইকেট নিলাম, সৃষ্টিকর্তার কাছে এসবের কোন মূল্য নেই।

মঈন বলেন, ক্রিকেটের বাইরে জীবনটা অনেক বড়। তাই মানুষের পাশে দাড়াতে চেষ্টা করি সব সময়। প্র্যাকটিসিং মুসলিম পরিচয়টা কখনোই গোপন করতে চাইনি। তাই দাড়ি রেখেই ক্রিকেট খেলছি। দাড়িওয়ালা মুসলিমদের সম্পর্কে মিডিয়ার চিত্রটা ইতিবাচক নয়। এই অবস্থার পরিবর্তনে ভুমিকা রাখতে পারলেই ক্যারিয়ার নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবো। আমি চাই, আমাকে দেখে সবাই যেন ইসলাম সম্পর্কে সঠিক ধারণা পায়।

মানবিক মঈন আলী

২০১৪ সালে ভারতের বিপক্ষে হোম সিরিজে সাউদাম্পটন টেস্টে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি জানিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন মইন আলী। ২৮ জুলাই টেস্টের দ্বিতীয় দিনে তিনি একটি ব্রেসলেট পরেছিলেন, যাতে লেখা ছিলো সেভ গাজা, ফ্রি প্যালেস্টাইন। ঘটনাটি ওই সময় বিশ্ব মিডিয়ায় আলোড়ন তুলেছিল। এমনকি মঈন আলীর কাউন্টি ক্লাব ওরচেস্টারশায়ারে বেনামী চিঠি পাঠিয়ে তাকে মৃত্যুর হুমকিও দেয়া হয়েছিল।

এসব ব্যাপারে সব সময়ই সতীর্থদের কাছ থেকে সমর্থন পেয়েছেন মঈন। ফিলিস্তিনের পক্ষে স্লোগান লেখা ব্রেসলেট পরতেও তাকে বাধায় দেয়নি ইংল্যান্ড এন্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড। ওরচেস্টারশায়ারে খেলার সময় ক্লাবের পক্ষ থেকে তাকে আলাদা নামাজের ঘর দেয়া হয়েছিল। ক্লাবটিকে মঈন আলী অনুরোধ করেছিলেন বিয়ার কোম্পানির লোগো বাদ দিয়ে তার জন্য আলাদা জার্সি তৈরি করতে। কারণ ধর্মীয় কারণে কোন বিয়ার কোম্পানির বিজ্ঞাপন নিজের পোশাকে বহন করতে চান না। ক্লাব কর্তৃপক্ষ মেনে নিয়েছিল তার দাবি।

বিভিন্ন দাতব্য সংস্থার সাথেও জড়িত আছেন এই অলরাউন্ডার। স্ট্রিট চান্স নামের একটি সংস্থার হয়ে ব্রিটেনের বিভিন্ন এলাকায় সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ফ্রি ক্রিকেট কোচিং করান। অরফানস ইন নিড নামের একটি আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থার গ্লোবাল ব্রান্ড অ্যাম্বাসাডর তিনি, এই সংস্থাটির লোগো দেখা যায় তার ব্যাটেও।

moin ali wife
মঈন আলীর স্ত্রী ও সন্তানেরা

মঈন আলীর স্ত্রী

ওরচেস্টারশায়ারে খেলার সময়ই মঈন আলী বিয়ে করেন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ফিরোজা হোসেনকে। জন্ম-বেড়ে ওঠা দুটিই ইংল্যান্ডে হলেও ফিরোজার বাপের বাড়ি সিলেটে। এক সময় সিলেট শহরের পীর মহল্লা এলাকার বাসিন্দা ছিলেন ফিরোজার বাবা-মা। সেখানে ফিরোজাদের বাড়ি আছে এখনো।

মঈন আলীর শ্বশুড় বাড়ি কোথায়

পরবর্তীতে তারা ইংল্যান্ডে চলে যান, সেখানেই জন্ম ফিরোজার। বিয়ের পর জামাই মঈন আলীও বেড়াতে এসেছিলেন শ্বশুড় বাড়িতে। এই দম্পতির একটি ফুটফুটে পুত্র সন্তান রয়েছে আবু বকর নামে, আর তাদের কন্যার নাম হাদিয়াহ।

২০১৬ সালে বিশ্বব্যাপী উগ্রবাদের বিস্তারের কারণে যখন বাংলাদেশ সফরে আসতে চাচ্ছিলেন না ইংল্যান্ডের ক্রিকেটাররা, তখন মঈন আলী তার সতীর্থদের আশ্বস্ত করেছেন বাংলাদেশ সম্পর্কে। সেবার ইংল্যান্ড দলের বাংলাদেশ সফরের পক্ষে তিনি নিয়মিতই ইতিবাচক মত দিয়ে গেছেন সংবাদ মাধ্যমে।

অবসরের পর অনেক ক্রিকেটারেরই আগ্রহ থাকে কোচিং কিংবা ধারাভাষ্যে ক্যারিয়ার গড়ার; কিন্তু মঈন জীবনের সফলতা খোঁজেন অন্য কিছুতে। অবসরের পর হতে চান মুয়াজ্জিন, থাকতে চান মানুষের পাশে। তিনি বলেন, মসজিদে আজান দেয়া কিংবা মসজিদ পরিস্কারের কাজ পেলে আমি সবচেয়ে খুশি হবো। জীবনে অনেক কিছু পেয়েছি, বাকি সময়টুকু মানুষের মাঝে কাটাতে চাই, তাদের পাশে দাড়াতে চাই। আমার মনে হয় এতেই আমি সবচেয়ে বেশি তৃপ্তি পাবে।

আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন : আহমেদ স্টোর

০৭-০৪-২০২১

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top