এখন অনলাইনের (online) যুগ। আগে কাগজে ছাপা পত্রিকা সংবাদ প্রকাশের একমাত্র উপায় থাকলেও এখন পাশাপাশি চলে এসেছে অনলাইন প্লাটফর্ম। দেশে দেশে, শহরে শহরে এমনকি গ্রাম গঞ্জেও গড়ে উঠেছে অনলাইন পোর্টাল।
এর একটাই কারণ- মানুষের কাছে ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়া। অনলাইনে এখন মানুষ খবর পড়তে চায়। তথ্য জানতে চায়। যে কারণে অনলাইন সাংবাদিকতা (Online Journalism) দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে।
বিশ্বের অনেক নামীদামি পত্রিকা তাদের ছাপা সংস্করণ বন্ধ করে দিয়ে, শুধু অনলাইন নির্ভর হয়ে পড়েছে। আবার গড়ে উঠছে নতুন নতুন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম।
আমাদের দেশেও এখন অনেকগুলো অনলাইন সংবাদ মাধ্যম রয়েছে যেগুলো পুরোপুরি পেশাদার। যেমন বাংলা ট্রিবিউন, ঢাকা পোস্ট, বিডি নিউজ ইত্যাগি।
আবার প্রতিটি দৈনিক পত্রিক ও টিভি চ্যানেলের রয়েছে অনলাইন পোর্টাল। যেখানে প্রতি মূহুর্তে নতুন নতুন সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে।
এসব কারণে অনলাইন সাংবাদিকতাও (Online Journalism) দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। অনলাইন সাংবাদিকতা বিষয়ক কিছু টিপস দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে এই লেখায়।
অনলাইন সাংবাদিকতার মূল প্রতিপাদ্য
- সবার আগে
- সঠিক সংবাদ
সবার আগে সংবাদ পরিবেশন করতে গিয়ে অনেক সময় সঠিক মানটি ধরে রাখা কঠিন হয়ে ওঠে। প্রায় দেখা যায় দ্রুত সংবাদ পরিবেশন করতে গিয়ে ভুল তথ্য পরিবেশন করা হয়।
তাই এ দুটোর সমন্বয় করতে না পারলে পত্রিকা কিংবা সাংবাদিকদের গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখা কঠিন হবে।
হিট বাড়াতে গিয়ে ঘটনা সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়েই দ্রুত সংবাদ লিখলে এ ধরণের ভুল হতে পারে। তাই অনলাইন সাংবাদিকদের অবশ্যই সাবধান থাকতে হবে এ বিষয়ে।
কারণ সবার আগে দিতে গিয়ে যদি সঠিক সংবাদ না দেয়া যায়, তাহলে প্রতিষ্ঠানের যেমন বদনাম হবে, সেই সাথে নিজের ক্যারিয়ারেরও ক্ষতি হবে।
‘অনলাইন সাংবাদিকতা হচ্ছে টি-টোয়েন্টির ব্যাটিংয়ের মতো’
এই উক্তিটি করেছেন দেশের খ্যাতিমান ক্রীড়া সাংবাদিক তারেক মাহমুদ। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট মানেই কিন্তু ধুমধাড়াক্কা নয়।
এই লেখা যখন লিখছি তখন টি-টোয়েন্টি র্যাংকিংয়ের এক নম্বর ব্যাটসম্যান বাবর আজম, দুই নম্বরে আছেন আরেক পাকিস্তানি মোহাম্মাদ রিজওয়ান।
তারা দুজন কখনোই ধুমধাড়াক্কা ক্রিকেট খেলেন না। বরং তারা হিসেবি ক্রিকেট খেলেন।
দুজনেই বলে বলে রান তোলা আর সুযোগ পেলেই চার-ছক্কা মারার চেষ্টা করেন। বিরাট কোহলিও টি-টোয়েন্টির ক্রিকেটের সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন। তার বেলাতেও একই কথা।
এমন ব্যাটসম্যানরা ডট বলা দিতে চান না, বরং প্রতিটি বলকে তার মেরিট অনুযায়ী ব্যাবহার করেন। সেটি সিঙ্গেল রান হোক, কিংবা চার-ছক্কা।
অনলাইন সাংবাদিকতাও এমন। এখানে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে কাজ করতে হবে; কিন্তু সেই সাথে সাংবাদিকতার সবগুলো দিক খেয়াল রাখতে হবে।
ধুমধাড়াক্কা সাংবাদিকতা করতে গেলে ভুল হয়ে যেতে পারে। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে এমন ভুল হতে পারে যা প্রতিষ্ঠান ও নিজের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে।
তাই সাবধানতার সাথে এগোতে হবে অনলাইন সাংবাদিকদের।

অনলাইন সাংবাদিকতায় কী গুরুত্ব পাবে?
- অনলাইনের পাঠক কারা?
- তারা কী পছন্দ করে?
যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করে তারাই অনলাইনের পাঠক। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অনলাইনের প্রধান পাঠক শ্রেণি হলো তরুণ-যুব সমাজ। তাদের হাতে হাতে স্মার্ট ফোন, বাসায় কম্পিউটার।
কাজেই তারাই অনলাইনে সবচেয়ে বেশি খবর পড়ে। তাই তরুণা কী পছন্দ করে, কোন ধরণের খবর তাদের আকৃষ্ট করে সেটি খেয়াল রাখতে হবে অনলাইন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে।
আমার মনে হয় বাংলাদেশর তরুণ সমাজ সবচেয়ে বেশি পড়ে খেলাধূলার খবর। এরপর বিনোদন জগতের খবর। এছাড়া ক্যারিয়ার, সাফল্য, তথ্য-প্রযুক্তি, উদ্ভাবন- এ জাতীয় খবরগুলোও তরুণ পাঠকদের আকৃষ্ট করে।
আন্তর্জাতিক খবরেরও বড় পাঠক শ্রেণি আছে তাদের মাঝে। তাই এই বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে অনলাইন সাংবাদিকদের।
‘ধোলাইখানে সড়ক দুর্ঘটনায় ২ জন নিহত’, কিংবা ‘সরকারের অবকাঠামো প্রকল্পে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ’ এ ধরণের খবর তাদের খুব একটা আকৃষ্ট করবে না।
আরো পড়ুন :
সংবাদ ও সাংবাদিকতার প্রাথমিক ধারণা
অনলাইন-সাংবাদিকতার ধরণ
- সংক্ষিপ্ত সময় : এখানে খুব কম সময়ের মধ্যে খবর পরিবেশন করা হয়। পত্রিকার ছাপা সংস্করণের সাধারণত দিনের খবর সন্ধ্যায় লিখে, রাতে ছাপাখানায় যায়।
- তাই ধীরে সুস্থে সংবাদ লেখা যায়। কিন্তু অনলাইনে সেই সুযোগটা নেই।
- পাঠকের সংখ্যা ও প্রতিক্রিয়া জানা যায় : এখানে কতজন পাঠক সংবাদটি পড়লো সেটি জানা যায়। কাজেই প্রতিটি সংবাদের গ্রহণযোগ্যতা টের পাওয়া যায়।
- এছাড়া সংবাদের নিচে পাঠকরা মন্তব্য করে, সোস্যাল মিডিয়ায় লাইক/কমেন্ট/শেয়ার করে। সেটিও পাঠকের প্রতিক্রিয়া বোঝার উপায়।
- পাঠকরা কী চায় সেটি বোঝা যায় : কোন ধরণের নিউজে পাঠকের প্রতিক্রিয়া বেশি হয়, পাঠক বেশি আসে তা সহজেই বোঝা যায় অনলাইনে।
- ঝুঁকি বেশি : দ্রুত কাজ করতে হয় বিধায় অনলাইন সাংবাদিকতায় ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে।
- ছাপা পত্রিকায় সাধারণত ধীরে সুস্থে সংবাদ লেখার পর সেটি সাব-এডিটর, বার্তা সম্পাদক, প্রুফ রিডারের হাত ঘুরে ছাপাখানায় যায়।
- কিন্তু অনলাইন মাধ্যমে লোকবল কম থাকায় এতগুলো ধাপে যাচাই করা যায় না। আবার দ্রুত সংবাদ পরিবেশনের তাড়া থাকে। যে কারণে অনলাইনে ভুল হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
অনলাইন সাংবাদিকদের যোগত্যা
- দ্রুত কাজ করার দক্ষতা
- নির্ভুল কাজ করার দক্ষতা (বানান, ব্যাকরণ, তথ্য)
- সম্পাদনার জ্ঞান
- চাপ নেয়ার ক্ষমতা (২৪ ঘণ্টা নিউজ)
- আত্মবিশ্বাস
- নিউজ সেন্স : কোন ঘটনা দেখে বা শুনে দ্রুত সেটি কোন আঙ্গিকে পরিবেশন করা উচিত সেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এক্ষেত্রে অনেক সময় কারো কাছ থেকে পরামর্শ নেয়ারও সুযোগ থাকে না।
- তাই অনলাইন সাংবাদিকদের নিউজ সেন্স প্রখর হতে হয়।
- ব্যতিক্রমী চিন্তা : হাজারো অনলাইন পোর্টালের যুগে আপনাকে প্রতিযোগীতায় নামতে হবে অন্যদের সাথে। তাই গতানুগতিক চিন্তা করলে আপনি পিছিয়ে পড়বেন।
- যেমন, ধরুন বনানীতে একটি শপিং মলে আগুন লেগেছে। এই খবর সবাই দেবে; কিন্তু একটি ছেলে ওই ভবনে আটকা পড়ে ফেসবুক পোস্ট দিয়েছে; কিংবা মাকে ফোন করে বলেছে- মা দোয়া করো, বেঁচে থাকলে দেখা হবে।
- এই সংবাদটি পরিবেশন করতে পারলে সেটি পাঠকদের হৃদয় ছুয়ে যাবে। অনলাইন সাংবাদিকদের এ ধরণের ব্যতিক্রমী চিন্তা করতে জানতে হবে।
- পাঠক টানার কৌশল : আকর্ষণীয় শিরোনাম, ইন্ট্রো ও ছবি দিয়ে পাঠকদের আকৃষ্ট করতে হবে। তা না হলে পাঠকরা অন্য প্ল্যাটফর্মে চলে যাবে।
পাঠক ধরে রাখার কৌশল
- আকর্ষণীয় উপস্থাপনার মাধ্যমে পাঠক ধরে রাখতে জানতে হবে। কেনা পত্রিকা মানুষ বাসায় রেখে সময় নিয়ে এমনকি কয়েক দিন পরেও পড়তে পারে।
- কিন্তু অনলাইনে মেগাবাইট খরচ করে মানুষ আপনার সংবাদ কেন পড়বে?
- এখানে আপনার জানতে হবে পাঠকে ধরে রাখার কৌশল। পড়তে শুরু করার পর পাঠক মজা না পেলে অন্য কোথাও চলে যাবে।
- প্রযুক্তিগত দক্ষতা : কখনো কখনো স্পটে বসেই মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপে সংবাদ লিখে পাঠাতে হয়। সেই সাথে পাঠাতে হয় ছবি ও ভিডিও। কখনো এগুলো সম্পাদনার কাজও করতে হয়।
- তাই অনলাইন সংবাদিকদের আধুনিক প্রযুক্তির ওপর দখল থাকতে হবে।
- বহুমুখী দক্ষতা : একজন অনলাইন সাংবাদিককে একই সাথে সংবাদ সংগ্রহ, ছবি তোলা, ভিডিও ধারণের কাজ করতে হয়। আবার কখনো কখনো ভিডিও এবং নিউজ সম্পাদনাও করতে হয়।
- দৈনিক পত্রিকার মতো প্রতিটি কাজে আলাদা লোক ব্যবহারের বদলে অনলাইন পোর্টালগুলো খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এখন বহুমুখী দক্ষতা রয়েছে এমন লোক নিয়োগ দেয়ার চেষ্টা করে।
- প্রতিষ্ঠানের আয়ের কৌশলগুলো জানা : কোন ধরণের সংবাদে পাঠক বেশি আসে, বিজ্ঞাপন বেশি আসে সেটা জানতে হয় এবং সে অনুযায়ী সংবাদ পরিবেশন করতে হয়।
অনলাইন সাংবাদিকতা কোর্স
ঢাকাসহ বিভিন্ন বড় শহরে অনেক প্রতিষ্ঠান অনলাইন সাংবাদিকতা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে কোর্স করা যেতে পারে।
আবার কোন পেশাদার সংবাদ মাধ্যমে শিক্ষানবীস হিসেবে চাকুরিতে যোগদান করেও এই বিষয়টি আয়ত্ব করার সুযোগ রয়েছে।
তবে সবচেয়ে বেশি জরুরী নিজের চেষ্টা, পরিশ্রম আর পড়াশোন। মনোযোগ দিয়ে অনলাইন সংবাদ মাধ্যমগুলোর কার্যক্রম লক্ষ করা।
সংবাদ, সংবাদ পরিবেশনের স্টাইল ইত্যাদি খেয়াল করা।
আরো পড়ুন :
অনলাইন সাংবাদিকতা pdf
Online journalism pdf download here


