ইরানের একটি এলিট ফোর্স আইআরজিসি বা বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। নিয়মিত সেনাবাহিনীর চেয়েও অনেক বেশি ক্ষমতাধর এই বাহিনী। এদের আছে পৃথক সেনা, নৌ ও বিমান ইউনিট। বিদেশে অপারেশনের জন্য আছে আল কুদস ফোর্স। ইরানের সব গুরুত্বপূর্ণ সমরাস্ত্র থাকে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। এছাড়া দেশটির অর্থনীতি, পররাষ্ট্র নীতিসহ অনেক কিছুর ওপর প্রভাব বিস্তার করে আছে এই বাহিনী। তাহলে কতটা ক্ষমতাধর এই বাহিনী? কেন এটি গঠন করেছে ইরান? কিভাবেই বা কাজ করে বিপ্লবী গার্ড- সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানাবো
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী
চার দশক আগে ইরানের ধর্মীয় নেতাদের শাসন ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে গঠন করা হয়েছিল ইসলামিক রেভ্যুলশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি। নিয়মিত সামরিক বাহিনীর একটি বিকল্প বাহিনী হয়ে ওঠে এই বিপ্লবী গার্ড। ধীরে ধীরে এটি দেশটির সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সেক্টরের সবচেয়ে প্রতাপশালী বিভাগ হয়ে ওঠে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ১৯৭৯ সালে ইরানে বিপ্লবের পর ধর্মীয় নেতারা দেশটির সামরিক বাহিনীর ওপর পুরোপুরি ভরসা করতে পারছিলেন না বলেই বিকল্প এই বাহিনী গড়ে তোলা হয় । এরপর থেকে এই বাহিনীর প্রধান দায়িত্ব হয়ে ওঠে বিপ্লব পরবর্তী শাসনের ধারাকে অব্যাহত ও সুরক্ষিত রাখা।
ধর্মীয় নেতাদের শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে বিপ্লবী গার্ড গঠন করা হলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন সেক্টরে ভুমিকা রাখতে শুরু করে এই বাহিনী
বিপ্লবী গার্ড প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের আগে ইরানের শাসক শাহ মুহাম্মাদ পাহলভি তার ক্ষমতা সুসংহত করতে সবচেয়ে বেশি নির্ভর করতেন সেনাবাহিনীর ওপর; কিন্তু সেনাবাহিনী শেষ পর্যন্ত তাকে রক্ষা করতে পারেনি। বিপ্লব সংগঠিত হওয়ার পর সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেয়া আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি অনুভব করেন যে, তাদের একটি সুসংগঠিত ও শক্তিশালী বাহিনী দরকার, যাদের কাজ হবে ক্ষমতাসীনদের যে কোন মূল্যে রক্ষা করা। যে কারণে তারা নিয়মিতি সেনাবাহিনীর পাশাপাশি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী গঠন করেন, যার প্রধান দায়িত্ব হয় দেশের হয় শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা।
ধর্মীয় নেতাদের শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে বিপ্লবী গার্ড গঠন করা হলে পরবর্তীতে দেশটির বিভিন্ন সেক্টরে ভুমিকা রাখতে শুরু করে এই বাহিনী। তারা নিজেদের বিমান ও নৌ বাহিনীও গঠন করে। ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনীর দিক থেকে সদস্য সংখ্যায় এই বাহিনী অনেক ছোট হলেও তারা প্রবল ক্ষমতাধর।
বিপ্লবী গার্ডের ক্ষমতা
দেশে ও দেশের বাইরে অনেক সামরিক অভিযানের নেপথ্যে রয়েছে এই বাহিনী। বর্তমানে বিপ্লবী গার্ডের প্রধান কমান্ডার মেজর জেনারেল হোসেইন সালামী। পদাধিকার বলেই যিনি ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাদের পরামর্শদাতাদের একজন।
বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ইরানের একটি এলিট ফোর্স। এটি সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনীর অনুগত একটি বাহিনী। এর সক্রিয় সদস্য সংখ্যা ১ লাখ ৯০ হাজার। এই বাহিনীর আবার রয়েছে নিজস্ব পৃথক সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী। ইরানের সব কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র এই বাহিনীর তত্ত্বাবধানে থাকে।
আরো পড়ুন :
ক্রুজ ও ব্যালেস্টিক মিসাইলের পার্থক্য কী, কোনটি বেশি শক্তিশালী
কতটা শক্তিশালী রাশিয়ার এস -৫০০ মিসাইল সিস্টেম
সর্বত্র বাসিজ
এছাড়া বাসিজ নামে ৪০ হাজারের একটি আধাসামরিক বাহিনী আছে এর অধীনে। দেশের ভেতরে সরকারবিরোধী যে কোন ধরনের বিক্ষোভ বা সরকার পতনের চেষ্টা কঠোর হাতে দমন করে বাসিজ ফোর্স। দেশটির সর্বত্র এই বাসিজের স্বেচ্ছাসেবীদের শাখা রয়েছে। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় সর্বত্র বাসিজ, সরকারি দফতর থেকে মসজিদ সর্বত্র বাসিজ সক্রিয় থাকে শাসন ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে। ২০০৯ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর সরকার বিরোধী বিক্ষোভের সময় বাসিজ সদস্যরা বিক্ষোভকারীদের ওপর ব্যাপক দমনপীড়ন চালিয়েছে বলে অভিযোগ আছে। কয়েক ডজন বিক্ষোভকারীকে হত্যা ও কয়েক হাজার গ্রেফতারের অভিযোগ উঠেছে ওই সময়।
বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সবচেয়ে প্রভাবশালী
অংশ হচ্ছে কুদস ফোর্স
এছাড়া বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বনিয়াদ নামের একটি দাতব্য সংস্থা, যেটি ইরানের অর্থনীতিতে খুব প্রভাবশালী একটি প্রতিষ্ঠান। উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে, ইরানের তেলবহির্ভূত অর্থনীতির প্রায় ২০ শতাংশ জিডিপি এই প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে। অনেকের মতে বিপ্লবী গার্ডের নিয়ন্ত্রণে ইরানের অর্থনীতির ৩ ভাগের একভাগ। মিলিটিারি ইন্ড্রাস্টি ছাড়াও তাদের রয়েছে হাউজিং, বাধ ও সড়ক নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান। আছে তেল ও গ্যাস প্রকল্প, খাদ্য, পরিবহন এমনকি শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রকল্পও রয়েছে সংস্থাটির।
খাতাম আল আনবিয়া নামে বিপ্লবী গার্ডের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের রয়েছে লক্ষাধিক কর্মী, যারা কোটি কোটি ডলারের অবকাঠামো নির্মাণে কাজ করে। সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানী তার সরকারের অর্থনৈতিক সঙ্কটের সময় বিপ্লবী গার্ডের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ চেষ্টার কড়া সমালোচনা করেছিলেন।
কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে নিয়মিত নজরদারি করে বিপ্লবী গার্ডের নৌ বাহিনী। পারস্য উপসাগরের সাথে ভারত মহাসাগরের সংযোগ স্থাপনকারী এই সরু নৌপথ দিয়েই পরিচালিত হয় বিশ্বের তেল বাণিজ্যের ২০ শাতংশ। বিপ্লবী গার্ডের নৌ সেনারা বছর দুয়েক আগে যুক্তরাষ্ট্রের একটি যুদ্ধজাহাজকেও গতিপথ বদলাতে বাধ্য করেছিল।

বিপ্লবী গার্ডের বিমান ইউনিট কোন যুদ্ধবিমান পরিচালনা না করলেও ইরানের মিসাইল ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ তাদের হতে। পশ্চিমা সংবাদ মাধ্যমগুলোর মতে, ১০টির বেশি ব্যালেস্টিক মিসাইল ব্যাটারি আছে ইরানের হাতে। আর তাদের হাতে থাকা মিসাইলের সংখ্যা অন্তত কয়েকশো। ২০১৮ সালে উত্তর ইরাকে কুর্দি বিদ্রোহীদের ওপর ও সিরিয়ায় আইএসের ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরান ব্যালেস্টিক মিসাইল ছুড়েছিলো বলে জানা যায়।
কুদস ফোর্স কী
তবে আইআরজিসি বা বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সবচেয়ে প্রভাবশালী অংশ হচ্ছে কুদস ফোর্স। ইরান সরকার তাদের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্যপূরণে এই বাহিনীকে ব্যবহার করে বলে মনে করা হয়। দেশের সীমানার বাইরে ইরানের হয়ে ভুমিকা রাখে কুদস ফোর্স। এই বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন স্থানে ইরানের মিত্রদের অর্থ, সমরাস্ত্র, প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহযোগিতা করে।
সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে টিকিয়ে রাখতে কুদস ফোর্সের ভুমিকার কথা ইরান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবেও স্বীকার করেছে। ওই যুদ্ধে সিরিয়ার সেনাবাহিনীর পাশাপাশি অনেক শিয়া মিলিশিয়া যোদ্ধা লড়াই করেছে, যাদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়েছে ইরানের কুদস ফোর্স। ইরাকেও একই ধরণের কাজ করেছে তারা। যার ফলে কুদস ফোর্সের তৎকালীন কমান্ডার জেনারেল কাশেম সোলাইমানি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন ইরানের নাগরিকদের মাঝে।
কাশেম সোলাইমানি হত্যা
২০২০ সালের ৩ জানুয়ারি ইরাকের রাজধানী বাগদাদে ড্রোন হামলা কুদস ফোর্সের কমান্ডার জেনারেল কাশেম সোলাইমানিকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের দাবি, এই ঘটনার কয়েকদিন আগে ইরাকে রকেট হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে কাজ করা এক সিকিউরিটি কন্ট্রাক্টর নিহত হওয়ার পেছনে কাশেম সোলাইমানি জড়িত ছিলেন। এছাড়াও ওই অঞ্চলে মার্কিন কূটনীতিক ও সৈন্যদের ওপর আরো হামলার পরিকল্পনা করা হচ্ছিল।
নিহত হওয়ার দিন জেনারেল কাশেম সোলাইমানি গোপন সফরে বাগদাদ গিয়েছিলেন। বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার পরই তার গাড়ি বহরে ড্রোন হামলা চালানো হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের একটি গোয়েন্দা
ড্রোন ভূপাতিত করে তারা
লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথিদের মতো শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠিগুলোকে অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ সহায়তা দেয় কুদস ফোর্স। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা জুড়ে ইরানের হয়ে ছায়াযুদ্ধে মূল ভুমিকা পালন করে এই বাহিনী। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউনে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতকে বোমা হামালায় হত্যাচেষ্টার অভিযোগ ওঠে কুসদ ফোর্সের বিরুদ্ধে। ২০১৯ সালে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে এই সংস্থার এক এজেন্টকে শাস্তি দেয় জার্মানির একটি আদালত।

যে কারণে ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভূক্ত করে কুদস ফোর্সকে। এই প্রথম কোন সরকারি বাহিনীকে এই তালিকায় স্থান দিয়েছে তারা। এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে কুদস ফোর্স আরো আগ্রাসী ভুমিকা নিতে শুরু করে। একই বছর জুন মাসে হরমুজ প্রণালীর আকাশে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গোয়েন্দা ড্রোন ভূপাতিত করে তারা। পরের মাসেই ব্রিটেনের পতাকাবাহী একটি অয়েল ট্যাঙ্কারও আটক করে করে।
আরো পড়ুন :
সেরা অ্যাটাক হেলিকপ্টার : অ্যাপাচি নাকি এলিগেটর
আকাশ যুদ্ধে কতটা শক্তিশালী রাশিয়া
২০২০ সালের মে থেকে জুন মাস পর্যন্ত ৬টি অয়েল ট্যাঙ্কারে হামলার জন্যও ইরানের এই বাহিনীকে দায়ী করে যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের দুটি তেল কারখানায় হামলা ও ডিসেম্বরে ইরাকের মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার জন্যও তাদের অভিযুক্ত করা হয়। আর সর্বশেষ ওই হামলার কয়েকদিন পরই কুদস ফোর্সের কমান্ডার কাশেম সোলাইমানিকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র।
অন্যান্য খাতে বিপ্লবী গার্ড
সামরিক খাত ছাড়াও ইরানের বেসামরিক সেক্টরেও বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর রয়েছে ব্যাপক প্রভাব। ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীততেও তারা সব সময় প্রভাব বিস্তার করে। এই বাহিনী থেকে অবসরে যাওয়া জেনারেলদের সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে দেখা যায়। সাবেক স্পিকার আলী লারিজানিসহ অনেক কর্মকর্তা সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে এসেছেন পরবর্তীতে। সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদও এক সময় কুদস ফোর্সের হয়ে কাজ করেছেন।
বিপ্লবী গার্ডের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সময় সরকারের সমালোচনা করতেও দেখা যায়। ২০১৫ সালে পশ্চিমাদের সাথে পারমাণবিক চুক্তির সময় ইরান যেসব ছাড় দিয়েছিলো তা নিয়ে প্রকাশ্যে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানীর সমালোচনা করেছিলেন বিপ্লবী গার্ডের তৎকালীন প্রধান মোহাম্মাদ আল জাফারি। মোট কথা ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থায় সবচেয়ে প্রভাবশালী ইনস্টিউিটশন হিসেবে গড়ে উঠেছে এই বিপ্লবী গার্ড বাহিনী।
আমাদের ফেসবুক পেজটিতে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন : আহমেদ স্টোর



ভালো তথ্যবহুল লেখা।
ধন্যবাদ