ইস্তাম্বুল বিজয়ের ৫৭০ বছর উদযাপিত হয়েছে ২০২৩ সালে। ১৪৫৩ সালে বাইজেন্টাইন শাসকদের হাত থেকে তৎকালীন কনস্টান্টিনোপল আসে ওসমানীয় শাসনের অধীনে। এই বিজয়ে নেতৃত্ব দেন ২১ বছর বয়সী সুলতান দ্বিতীয় মোহাম্মাদ। নগরীর নতুন নামকরণ করা হয় ইস্তাম্বুল। দুই মহাদেশ জুড়ে গড়ে ওঠা এই নগরীর ভৌগলিক গুরুত্বের কারণে তিনি এখানেই ওসামানীয় খিলাফাহ’র রাজধানী স্থাপন করেন। টপিক :ইস্তাম্বুল কোন দেশের রাজধানী
এই নগরী বিজয়ের গৌরবোজ্জল ইতিহাস এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে এই লেখা
ইস্তাম্বুল কোথায় অবস্থিত
এটি তুরস্কের একটি নগরী। অতি প্রাচীন একটি নগরী এটি। বিশ্বের একমাত্র নগরী যা দুটি মহাদেশের মধ্যে পড়েছে। ইস্তাম্বুলের মাঝখানে রয়েছে ইউরোপ ও এশিয়া মহাদেশের বর্ডার। যে কারণে এই নগরী একটি অংশ পড়েছে ইউরোপে, আরেকটি অংশ পড়েছে এশিয়ায়।
ইস্তাম্বুলের মাঝখান দিয়েই বয়ে গেছে ঐতিহাসিক বসফরাস প্রণালী। এই প্রণালী ইউরোপ ও এশিয়াকে বিভক্ত করেছে। বসফরাসের দক্ষিণ দিক এশিয়া, আর উত্তর দিক ইউরোপ।
ইস্তাম্বুল নগরীর উত্তরে রয়েছে বুলগেরিয়া ও গ্রিস। পশ্চিমে মারমারা সাগর ও এরপর আজিয়ান সাগর। পূর্ব দিকে আছে কৃষ্ণসাগর। আজিয়ান ও মারমারা সাগর থেকে বসফরাস প্রণালী দিয়ে জাহাজ যায় কৃষ্ণাসাগরে।
দীর্ঘদিন ওসমানীয় সমস্যাজ্যের রাজধানী ছিলো ইস্তাম্বুল। তারপর প্রজাতান্ত্রিক তুরস্ক গঠনের পর রাজধানী সরিয়ে নেয়া হয় আঙ্কারায়।
ইস্তাম্বুল কোন দেশের রাজধানী
মে মাসের ২৯ তারিখে তুরস্ক জুড়ে যখন রিসেপ তাইয়েব এরদোয়ান সমর্থকরা বিজয়ের উৎসব করছিলেন, কাকতালীয়ভাবে সেই দিনটি ছিলো ইস্তাম্বুল বিজয়ের ৫৭০তম বার্ষিকী। যে কারণে ওসমানীয় খিলাফার গৌরবোজ্জল সেই বিজয়ের ইতিহাস আর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বিজয়ের উল্লাস মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিলো।
দুই দশক ধরে তুরস্কের ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানকে অনেকেই ওসামনীয় শাসকদের উত্তরসূরী বলে মনে করেন। উদার ইসলামপন্থী এই শাসককে অনেকে সুলতান এরদোয়ান বলেও সম্মোধন করেন। এরদোয়ান নিজেও ইস্তাম্বুলেরই সন্তান। যে কারণে এবার দুই উৎসব এক সাথেই উদযাপন করেছে তুর্কিরা।

সে সময়ে ইস্তাম্বুলের নাম ছিলো কনস্টান্টিনোপল, আরবরা বলতো কুস্তুনতুনিয়া। সেটি ছিলো দাপুটে রোমান সম্রাজ্যের রাজধানী। ওসমানীয় খিলাফার তৎকালীন সুলতান ছিলেন দ্বিতীয় মোহাম্মাদ বা ফাতিহ সুলতান মেহমেদ। ইস্তাম্বুল বিজয়ের ব্যাপারে তিনি ছিলেন দৃঢ় প্রতীজ্ঞ। এর আগে অন্তত ২৮ বার ইস্তাম্বুল অবরোধ ও আক্রমণ করেও সফল হতে পারেনি ওসামনীয়রা।
রোমান সম্যাজ্যের রাজধানী হওয়ার কারণে ইস্তাম্বুল ছিলো খুবই সুরক্ষিত একটি শহর। চারদিকে ছিলো উচু দেয়াল। এছাড়াও নানা আয়োজন ছিলো প্রতিরক্ষার জন্য। মোট কথা শহরটিকে একটি দুর্গে রূপ দিয়েছিলো রোমান শাসকরা। আগের প্রতিটি অভিযান ব্যর্থ হওয়ায় এবার নতুন করে পরিকল্পনা সাজান তরুণ শাসক। বেশ কিছু কৌশল গ্রহণ করেন তিনি। যার ফলে শেষ পর্যন্ত তার বাহিনী সফল হয়।
ইস্তাম্বুল নিয়ে মহানবী সা. এর ভবিষ্যতবাণী
ভৌগলিক গুরুত্ব ছাড়াও মুসলিমদের কাছে ইস্তাম্বুল নগরীর গুরুত্ব ছিলো বিশেষ। এই নগরীর বিষয়ে ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন মহানবী হযরত মোহাম্মাদ সা.। তিনি বলেছিলেন, নিশ্চিতভাবেই একদিন ইস্তাম্বুল বিজয় করা হবে। কত মহান হবেন সেই সেনাপতি, আর মহান হবে তার সৈন্যরা!
ইতিহাসবিদরা মনে করেন, রাসুল সা. এর এই ভবিষ্যতবাণীর কারণেই ওসমানীয় শাসকরা বারবার ইস্তাম্বুল বিজয় করতে অভিযান চালিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত সেই বিজয় আছে ১৪৫৩ সালে সুলতান দ্বিতীয় মোহাম্মাদের হাত ধরে।
বিজয় বার্ষিকীর দিন ইস্তাম্বুলের ঐতিহাসিক আয়া সোফিয়া মসজিদে ফজরের নামাজে যোগ দেন তুরস্কের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সোলায়মান সোইলু, তুরস্কের সর্বোচ্চ ধর্মীয় সংস্থা দিয়ানেতের প্রধান আরী এরবাস, ইস্তাম্বুলের গভর্নর আলী এরলিকায়াসহ গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা।
মুসলিম স্কলারদের মতে, ইস্তাম্বুল বিজয়ের মাধ্যমে মহানী সা. এর ভবিষ্যতবাণীকেই পূর্ণতা দিয়েছিলেন দ্বিতীয় মোহাম্মাদ।
ইস্তাম্বুল বিজয়
১৪৫৩ সালের ২১ ও ২২ এপ্রিল রাতে ৬৭টি ছোট ও মাঝারি জাহাজ স্থল পথে গোল্ডেন হর্ন খাড়িতে নিয়ে যায় ওসমানীয় সৈন্যরা। এই খাটিটি বরফরাস প্রণালীতে গিয়ে পড়েছে। জাহাজগুলো নেয়ার জন্য সৈন্যদের পাশাপাশি ব্যবহার করা হয়েছিলো হাতি ও ঘোড়ার বহর। তাদের এই কৌশলের কথা রোমানরা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি।
আক্রমণের বিষয়ে সুলতান দ্বিতীয় মোহাম্মাদ ছিলেন কৌশলী। স্থল, নৌ ও সুরঙ্গ পথে তিনি আক্রমণের পরিকল্পনা সাজান। ইস্তাম্বুলের পশ্চিম দিকের এডিরনো প্রদেশে যুদ্ধপ্রস্তুতি সম্পন্ন করেন। সেখান থেকে আক্রমণ সহজ হবে মনে করে, সেখানে জড়ো করেন স্থল বাহিনীকে।
ইস্তাম্বুলের চারদিকের প্রথম সুরক্ষা দেয়ালটি নির্মিত হয়েছিলো খ্রিস্টপূর্ব ৫৬৭ সালে। ২০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে রোমান শাসক সেপ্টেমিয়াস সেভেরাসের অভিযানের সময়ে দেয়ালটি ধ্বংস হয়। এরপর শহরের সুরক্ষার জন্য নতুন আরেকটি দেয়াল তৈরি করা হয়, যেটি আয়া সোফিয়া পর্যন্ত গিয়ে পৌছেছে।
পরবর্তীতে কনস্টান্টিনিয়াসের সময় আবারো একটি দেয়াল তৈরি করা হয়। এই দেয়ালটি মারামারা উপকূল থেকে গোল্ডেন হর্ন খাড়ি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। মোট কথা কোন শাসকই ইস্তাম্বুলকে বাইরের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে নিরাপত্তায় ছাড় দেনিন।
যেভাবে এগিয়ে চলে অভিযান
বাইজেন্টাইনদের কমান্ডার বার্তোলেমেও একটি শক্ত শেকল দিয়ে গোল্ডেন হর্নের মুখ বন্ধ করে দেন। যার ফলে ওসমানীয় নৌ বাহিনী কিছুটা সমস্যায় পড়ে। এই সময়ে স্থল বাহিনীকে ইস্তাম্বুলের কাছাকাছি নিয়ে যান সুলতান।
তার বাহিনীতে ছিলো প্রায় ৮০ হাজার যোদ্ধা। এক পর্যায়ে তারা স্থল ও নৌ পথে নগরীটি অবরোধ করে ফেলে। নৌ বাহিনীতে ছিলো ১৪৫টি জাহাজ ও অনেকগুলো ছোট নৌকা। কামানের গোলা ছুড়ে অবরোধের কথা জানান দেয়া হয় সেখানকার শাসকদের। স্থলপথে গোর্ল্ডে হর্ন পর্যন্ত নেয়া নৌকাগুলোও আরেক দিক থেকে অগ্রসর হতে শুরু করে।
গোল্ডেন হর্ন খাড়িতে ওসামনীয় জাহাজগুলো পুড়িয়ে দেয়ার দায়িত্ব পেয়েছিলেন বাইজেন্টাইন ক্যাপ্টেন গিওরকোমো কোকো; কিন্তু তিনি ব্যর্থ হন এবং জাহাজসহ তাকে ডুবিয়ে দেয় ওসমানীয় নৌ বাহিনী। সৈন্যদের একটি দল গোল্ডেন হর্নের মুখে লাগানো শেকল ছিড়তে চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয়। এই সময় সুরঙ্গ পথে অগ্রসর হতে শুরু করে আরেক দল সৈন্য।
তবে সুরঙ্গ পথে আক্রমণের চেষ্টা টের পেয়ে বাইজেন্টাইন সৈন্যরা বেশ কয়েক বার সুরঙ্গের মুখ ধ্বংস করে দেয়। অন্তত সাত দফায় সুরঙ্গ পথে আক্রমণের চেষ্টা করেও সফল হতে পারেনি।
জেনিসার ব্যাটালিয়ন
এই সময়ে ইস্তাম্বুলের শাসকদের কাছে আরো এক দফা দূত প্রেরণ করেন সুলতান; কিন্তু তারা আত্মসমর্পনের প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। তারপর ২৯ মে ভোরে চূড়ান্ত আক্রমণ শুরু করে ওসমানীয় বাহিনী। তিন দিক থেকে শুরু হয় প্রচণ্ড হামলা। প্রথম দুই ঘন্টায় বাশি-বাজুক বাহিনী দেয়াল টপকানোর চেষ্টা চালায়। এরপর তাদের জায়গায় আসে আনাতোলিয়ার ব্যাটালিয়ন। শেষ পর্যন্ত জেনিসারি ব্যাটালিয়নের সদস্যরা দেয়ালের ওপর চড়তে সমর্থ হয়।
সেদিন বিকেলেই নগরীতে প্রবেশ করেন দ্বিতীয় মোহাম্মাদ। নগরীতে ঢুকে সুলতান যান ঐতিহাসিক আয়া সোফিয়ার কাছে। সেখানে তিনি নামাজ আদায় করেন এবং ঘোষণা করেন, এখন থেকে আমার সিংহাসন হবে ইস্তাম্বুলে।
জেনিসার ব্যাটালিয়ন একটি পদাতিক বাহিনী। যা ছিলো ওসমানীয় সেনাবাহিনীর সবচেয়ে দুর্ধর্ষ ইউনিট। এটিকে ওসমানীয় বাহিনীর মেরুদ- বলে মনে করা হতো। সুলতানের সুরক্ষাসহ নিরাপত্তা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এই বাহিনী তদারকি করতো।
এই বাহিনীর সদস্যরা দেয়ালের ওপর চড়লে বিজয় অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। খুলে দেয়া হয় দেয়ালের দরজা। কেরকোপোর্তা দরজা দিয়ে ইস্তাম্বুলে ঢোকে ওসমানীয় সৈন্যরা। দরজার ওপর ওড়ানো হয় তাদের পতাকা। ১ হাজার ১২৩ বছর ধরে রোমান সম্রাজ্যের রাজধানী হয়ে থাকা নগরীটি অবশেষে ওসমানীয়দের অধিকারে আসে।
সুলতান দ্বিতীয় মোহাম্মাদ
এই নগরী বিজয়ের পরই সুলতানের নাম হয়ে যায় মোহাম্মাদ দ্য কনকোয়ারার। তুর্কি ভাষায় বলা হয় ফাতিহ সুলতান মোহাম্মাদ। মাত্র ২১ বছর বয়সী একজন শাসকের এই নৈপুণ্য হতবাক করে সবাইকে। সুলতান দ্বিতীয় মুরাদের সন্তান ছিলেন তিনি। প্রথম দফায় ২ বছর এবং দ্বিতীয় দফায় সিংহাসনে বসে ৩০ বছর দায়িত্ব পালন করেন মুহাম্মাদ।
ইতিহাসবিদরা বলেন, কনস্টান্টিনোপল বা ইস্তাম্বুলকে ৫৪ দিন অবরোধ করে রেখেছিলো সুলতানের বাহিনী। এই সময় বেশ কয়েকবার রোমান শাসকদের কাছে আত্মসমর্পনের আহ্বান জানিয়ে দূত প্রেরণ করা হয়েছিলো; কিন্তু প্রতিবারই তারা প্রস্তাব প্রত্যাখান করে।
আরো পড়ুন : ইস্তাম্বুলের ব্লু মস্ক
শেষ পর্যন্ত নগরীটি বিজয়ের মাধ্যমে শেষ হয় ১ হাজার ৫৮ বছরে বাইজেন্টাইন শাসনের। ইস্তাম্বুল হয়ে ওঠে ওসমানীয় সম্রাজ্যের নতুন রাজধানী। রাজধানীতে সম্রাটের প্রশাসনিক ও আবাসিক প্রাসাদ হিসেবে গড়ে তোলা হয় তোপকাপি প্যালেস। কয়েকশো বছর ওসমানীয় সম্রাজ্যের হেডকোর্য়াটার ছিলো এই প্রাসাদটি। ইস্তাম্বুল জয়ের ৬ বছর পর তোপকাপি প্যালেসের নির্মাণকাজ শুরু হয়।
বিশাল প্রাসাদ কম্পাউন্ডে চারটি চত্বর ও অনেকগুলো ছোট-বড় ভবন রয়েছে। নারীদের বসবাসের ভবনটির নাম হারেম। আবার সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বৈঠক হতো যে ভবনে, সেটির নাম ইম্পেরিয়াল কাউন্সিল ভবন। ছিলো বিশাল এক লাইব্রেরি। পরবর্তীতে অষ্টাদশ শতাব্দীর সুলতানরা এখান থেকে সদর দফতর সরিয়ে নেন বসফরাসের তীরে নির্মিত নতুন প্রাসাদে।
ওসমানীয় সম্রাজ্যের অবসানের পর তোপকাপি প্যালেসকে জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়। এখান রাসুল সা. ও তার সাহাবীদের বেশ কিছু স্মৃতি চিহ্ন রয়েছে। প্রতি বছর লাখো দর্শণার্থী ঘুরতে যান ঐতিহাসিক এই প্রাসাদে। টপিক :ইস্তাম্বুল কোন দেশের রাজধানী
আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন : আহমেদ স্টোর
৩১-০৫-২০২৩


