কুর্দিরা কি মুসলিম

কুর্দি কারা : ভূখণ্ডহীন জনগোষ্ঠি

মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল এক জনগোষ্ঠি কুর্দি জাতি । ভৌগলিক, রাজনৈতিক ও জাতিগতভাবে ওই অঞ্চলে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এই প্রাচীন জনগোষ্ঠিটি। দশকের পর দশক ধরে কুর্দিরা একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছে। এক সময়ে পৃথক রাষ্ট্র পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও, পরবর্তীতে সেটি আর হয়নি। কুর্দি কারা ? মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়া অঞ্চলের কয়েকটি দেশজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কুর্দি জনগোষ্ঠির ইতিহাস, স্বাধীনতা আন্দোলন ও তাদের জীবনচিত্র নিয়ে এই লেখা-

কুর্দি কারা

কুর্দি জনগোষ্ঠির বসবাস মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে। তবে তাদের শেকড় ইরানি। সংখ্যায় তারা ৩০ থেকে ৪৫ মিলিয়ন। বহু প্রাচীন এই সম্প্রদায়ের ইতিহাস। মেসোপটমিয়ার পাহাড়ি অঞ্চলের কারতি সম্প্রদায় আজকের কুর্দিদের পূর্ব পুরুষ বলে গবেষকদের ধারণা। আবার কুর্দি জনগোষ্ঠির অনেকে নিজেদের পূর্ব পুরুষ মনে করেন ইরানের মেদেস সম্প্রদায়কে।

এই ধারণাটিই কুর্দি সমাজে বেশি প্রতিষ্ঠিত। কুর্দিদের জাতীয় সঙ্গীতেও একটি লাইন রয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে ‘আমরা মেদেসদের সন্তান’।

অনেক গবেষক অবশ্য মনে করেন তুরস্কের পশ্চিমাঞ্চলীয় মারদেচেই সম্প্রদায় থেকে কুর্দিদের উদ্ভব। তবে কুর্দিদের ইতিহাসের সাথে ইরানের সংযোগটাই সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

মধ্যযুগের ইতিহাসে কুর্দিদের অনেক ঘটনার উল্লেখ রয়েছে।

আব্বাসীয় খিলাফার সুলতান আল মুতাসিমের যুগে বেশির ভাগ কুর্দি এলাকার নিয়ন্ত্রণ আরবদের হাতে আসে এবং তাদের বেশির ভাগ ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়। দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীতে বেশ কয়েকটি কুর্দি সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে এগুলো ছিলো ছোট ছোট এলাকাভিত্তিক যেমন আজারবাইজানের রাবাদিদ সম্রাজ্য।

এছাড়া আর্মেনিয়া, মেসোপটোমিয়া, আনাতোলিয়া, মিসর, সিরিয়া, পশ্চিম ইরানে পৃথক কুর্দি শাসন ছিলো।

মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ওসমানীয় সম্রাজ্য প্রসারিত হওয়ার পর কুর্দি জাতি আসে ইস্তাম্বুলের শাসনের অধীনে। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের আগ পর্যন্ত ওসমানীয় সম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্তই ছিলো কুর্দি জনপদগুলো।

কুর্দিস্তান অঞ্চল

সিআইএর ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুক অনুযায়ী সারা বিশ্বে কুর্দি জাতির জনগোষ্ঠির সংখ্যা ৩০ থেকে ৪৫ মিলিয়ন।

তবে কুর্দিশ ইনস্টিটিউট অব প্যারিসের তথ্য মতো, এই সংখ্যা ৪৫ মিলিয়ন বা সাড়ে চার কোটি পর্যন্ত হতে পারে। কুর্দিদের বসবাস মধ্যপ্রাচ্যের একেবারে কেন্দ্রস্থলে। অঞ্চলটির কয়েকটি দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এই জনগোষ্ঠিটি।

অন্যভাবে বলা যায় যে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যখন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মানচিত্র ঠিক করা হয়, সে সময় কুর্দি অধ্যুষিত ভূখণ্ড টি ভাগ হয়ে যায় কয়েকটি দেশের মধ্যে। ইরাকের কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলটি দক্ষিণ কুর্দিস্তান নামে পরিচিত। তেমনিভাবে তুরস্কে উত্তর কুর্দিস্তান, সিরিয়ায় পশ্চিম কুর্দিস্তান ও ইরানে রয়েছে পূর্ব কুর্দিস্তান।

ইরান, ইরাক, তুরস্ক, সিরিয়া জুড়ে ছড়িয়ে আছে কুর্দি জাতি

আবার দেশের নাম অনুযায়ী ইরাকি কুর্দিস্থান, তুর্কি কুর্দিস্তান নামেও ডাকা হয়।

আর পুরো অঞ্চলটি বৃহত্তর কুর্দিস্তান নামে পরিচিত। এসব দেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলো নিয়েই কুর্দিস্তান। অর্থাৎ কুর্দিদের বসবাস বিভিন্ন দেশে হলেও সেটি একটি অঞ্চল; কিন্তু অঞ্চলটির মাঝখানে পড়েছে কয়েকটি দেশের সীমান্তের কাটাতারের বেড়া।

কুর্দি জাতি নিয়ে সঙ্কট

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর কুর্দিদের মাঝে জাতীয়তাবাদী চেতনা জেগে ওঠে এবং একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের দাবি ওঠে।

১৯২০ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মিত্র শক্তির জয়ের পর যে সেভার্স চুক্তি হয়েছিল সেখানে একটি পৃথক কুর্দি ভূখণ্ড গড়ার কথা ছিলো; কিন্তু তিন বছর পর লুজান চুক্তিতে তুরস্ক ও প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের সীমানা নির্ধারিত হলে কুর্দিদের কপাল পোড়ে।

এসময় পশ্চিমারা কুর্দিদের সাথে করা আগের অঙ্গীকার ভুলে যায়। অবশ্য এর পেছনে তুরস্কের কামাল আতাতুর্ক ও তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনের ভুমিকা ছিলো। অনেকে বলেন কামাল আতাতুর্কের চাপেই পৃথক কুর্দি রাষ্ট্র হতে পারেনি।

এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ১৯২৫ সালে ব্রিটেনের সমর্থন নিয়ে তুরস্কের পূর্বাঞ্চলে একটি স্বাধীন কুর্দি রাষ্ট্রের ঘোষণা দেয়া হয়; কিন্তু কামাল আতাতুর্কের সরকার সেই ‘কুর্দিশ রিপাবলিক অব আররাত’ রাষ্ট্রটি গঠনের উদ্যোগ সফল হতে দেয়নি। এছাড়াও ইরাক ও ইরানে বিভিন্ন সময়ে ছোট পরিসরে কুর্দি রাষ্ট্রগঠনের চেষ্টাও হয়েছিল।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলো সোভিয়েত ইউনিয়নের পৃষ্ঠপোষকতায় ইরানের কয়েকটি জেলা নিয়ে ঘোষিত রিপাবলিক অব মাহাবাদ। ১৯৪৬ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত টিকে ছিলো রাষ্ট্রটি।

সবচেয়ে বেশি সংখ্যক কুর্দি বাস করে তুরস্কে।

দেশটিতে তাদের সংখ্যা দেড় কোটির বেশি। কুর্দিরা তুরস্কের মোট জনসংখ্যার ১৮ শতাংশ। তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলে ইরাক ও সিরিয়ার সীমান্ত জুড়ে তাদের বসবাস। তুরস্কের কুর্দিদের বড় অংশটি দেশটির রাজনীতিতে সক্রিয় হলেও, বিচ্ছিন্নতাবাদও রয়েছে দেশটিতে। কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি বা পিকেকে নামক সশস্ত্র সংগঠনটি অনেকদিন ধরে আঙ্কারার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে চলেছে।

বিভিন্ন সময়ে তুরস্কের অভ্যন্তরে নাশকতাও চালিয়েছে সংগঠনটি।

তুরস্ক ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো এই সংগঠনটিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। পিকেকের বিরুদ্ধে তুরস্ক সীমান্ত এলাকায় এবং ইরাক ও সিরিয়ার ভূখণ্ডে ঢুকেও একাধিকবার সামরিক অভিযান চালিয়েছে। কুর্দিদের ইন্ধন দেয়ার জন্য পশ্চিমাদের অভিযুক্ত করে আঙ্কারা।

কুর্দি কারা । ইরাকি কুর্দিস্তান কোথায়

ইরাকে বসবাস করে ৬০ লাখের মতো কুর্দি জনগোষ্ঠি।

তারা ইরাকের মোট জনসংখ্যার ১৭ শতাংশ কুর্দি জাতি। দেশটির উত্তরাঞ্চলে ইরাকি কুর্দিস্তান হিসেবে পরিচিত অঞ্চলটি বাগদাদের সরকারের কাছ থেকে পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন ভোগ করে। ইরবিল শহরে রাজধানী এই স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চলটির। এছাড়া কিরকু, মসুলের মত শহরগুলোতেও কুর্দিদের বসবাস। কুর্দি কারা

দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ১৯৭০ সালে ইরাকের কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলটি স্বায়ত্বশাসন লাভ করে মুস্তাফা বারজানির নেতৃত্বে। তবে অঞ্চলটিতে স্থিতিশীলতা আসতে অনেক দিন লেগেছে। ২০১৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা অভিযানের সময় মার্কিন সেনাদের স্বাগত জানিয়ে মিছিল করেছিল ইরাকী কুর্দিরা।

সর্বশেষ ২০১৭ সালে এক গণভোটের পর মুস্তাফা বারজানির ছেলে মাসুদ বারজানির নেতৃত্বে স্বাধীনতা ঘোষণা করে ইরাকের কুর্দিরা। তবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অভাবে সেই ঘোষণা টেকেনি শেষ পর্যন্ত। ওই সময় বিশ্বের একমাত্র দেশ ইসরাইল যারা কুর্দিস্থানের স্বাধীনতার দাবিকে পূর্ণ সমর্থন করছে।

বহু বছর ধরেই ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যের কুর্দিদের সাথে বিভিন্নভাবে সম্পর্ক রক্ষা করছে। মধ্যপ্রাচ্যে একঘরে অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে এই কৌশলটি নিয়েছিলেন ইসরাইলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেনগুরিয়ান। সেই সূত্রেই মুস্তফা বারজানির সাথে সম্পর্ক ছিলো তেল আবিবের।

১৯৬৮ ও ৭৩ সালে দুই দফায় ইসরাইল সফরও করেছিলেন ইরাকি কুর্দিদের তৎকালীন নেতা মুস্তফা। কৌশলগত কারণেই চারটি মুসলিম রাষ্ট্রের মাঝখানে অবস্থিত এই ভূখণ্ড টির স্বাধীনতা চায় তেলআবিব। কুর্দিরাও প্রতিবেশীদের থেকে কোন সহায়তা না পেয়ে ইসরাইলের দিকে ঝুকে আছে।

ইরানে ৮০ লাখের বেশি কুর্দি নাগরিক। দেশটির উত্তরপূর্বাঞ্চলে বসবাস করা এই নাগরিকরা ইরানি সংস্কৃতির সাথে অনেকটাই মিলেমিশে একাকার। সাম্প্রতিক অতীতে তেহরানের মেয়র এমনকি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও প্রার্থী হতে দেখা গেছে কুর্দি নেতাদের।

ইরানের কুর্দিদের বিচ্ছিন্নতাবাদের প্রবণতাও অন্য দেশগুলোর চেয়ে কম। আর সিরিয়ায় ১৬ লাখের মতো কুর্দি জাতি গোষ্ঠির বসবাস। এছাড়া আর্মেনিয়া, আজারবাইজনাসহ ওই অঞ্চলের অন্য কয়েকটি দেশে অল্প সংখ্যক কুর্দিদের বসবাস।

মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে জার্মানিতে ১২ থেকে ১৫ লাখ কুর্দি বসবাস করে। ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডসহ ইউরোপের আরো কিছু দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে তারা। এদের বড় একটি অংশ অতীতে বিভিন্ন সময়ে কুর্দি বিদ্রোহের সময় দেশ ছেড়ে পালিয়ে ইউরোপে আশ্রয় নিয়েছে।

কুর্দিদের ধর্ম

কুর্দি জাতি গোষ্ঠির মাঝে বিভিন্ন ধর্মের অনুসারী রয়েছে।

তবে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক সুন্নী মুসলিম। শিয়াদের সংখ্যাও কয়েক মিলিয়ন। এছাড়া আলাভি, ইয়াজিদি, খ্রিস্টান এবং আরো কিছু ধর্মের অনুসারী আছে।

প্রাচীন জনগোষ্ঠি হওয়ার কারণে কুর্দিদের সংস্কৃতি খুবই সমৃদ্ধ। পোশাক, স্থাপত্য খাবার, বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠানসহ সব কিছুতে রয়েছে তাদের নিজস্ব রীতি। তবে কুর্দি সংস্কৃতিতে প্রাচীন ইরানি প্রভাব রয়েছে। এমনকি কুর্দিদের অনেকে ইরানি নববর্ষের নওরোজ উৎসবও পালন করে। এছাড়া খেলাধূলা, নাটক-সিনেমার মত ক্ষেত্রগুলোতেও কুর্দিদের বিচরণ লক্ষণীয়। কুর্দি কারা

সব কিছুতেই আরবদের থেকে নিজেদের আলাদা ভাবার একটি প্রবণতা রয়েছে কুর্দি জাতির লোকদের। পৃথক জাতিসত্ত্বার পরিচয়টিকেই তারা বড় করে দেখাতে পছন্দ করে। যে কারণে আরবদের মাঝখানে থাকা সত্ত্বেও কয়েকশো বছরেও কুর্দি জাতি নিজস্ব সংস্কৃতির স্বকীয়তা হারাতে দেয়নি।

কুর্দি জাতি র ভাষা

কুর্দি জনগোষ্ঠির পড়াশুনা প্রধানত মাদ্রাসা নির্ভর, তবে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে পশ্চিমা ধাচের শিক্ষা ব্যবস্থায়ও তাদের বিচরণ রয়েছে।

কুর্দিদের নিজস্ব ভাষা রয়েছে। ইরান, ইরাক, সিরিয়া ও তুর্কি কুর্দিস্তানের বাসিন্দারা এই ভাষাতেই কথা বলে।

তবে পাশাপাশি নিজ নিজ দেশীয় ভাষায় পারদর্শী প্রায় সবাই। ইরাকে আরবির পাশাপাশি অফিশিয়াল ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে কুর্দি ভাষা। ইরানে এই ভাষাটি আঞ্চলিক ভাষার মর্যাদা পেয়েছে।

আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন : আহমেদ স্টোর

১৫-০৬-২০২১

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top