কারো কাছে চকলেটের দেশ, কারো কাছে ইউরোপের প্রশাসনিক রাজধানী। ইতিহাস প্রেমীদের কাছে আবার বীর নেপোলিয়ান বোনাপার্টের জীবনের শেষ যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত বেলজিয়াম Belgium। ছোট্ট দেশটি আছে ইতিহাস ও বিশ্ব রাজনীতির অনেকটা জায়গাজুড়ে। প্রাচীন স্থাপত্যের বহু নিদর্শন এখনো স্বগর্বে মাথা তুলে দাড়িয়ে আছে বেলজিয়ামে। আর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধ দেশটিকে স্থান দিয়েছে উন্নত বিশ্বের কাতারে।
আজ আমরা জানবো ইউরোপের ছোট দেশ বেলজিয়াম সম্পর্কে।
বেলজিয়াম দেশ পরিচিতি
অফিশিয়াল নাম : কিংডম অব বেলজিয়াম Kingdom of Belgium
রাজধানী : ব্রাসেলস
নেদারল্যান্ড থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা : ৪ অক্টোবর ১৮৩০
আয়তন : ৩০ হাজার ৬৮৯ বর্গকিলোমিটার
জনসংখ্য : ১ কোটি ১৫ লাখ (প্রায়)
জাতীয়তা : বেলজিয়ান
অফিশিয়াল ভাষা : ডাচ, ফেঞ্চ ও জার্মান
মুদ্রা : ইউরো
ধর্ম : ৬৩ শতাংশ খ্রিস্টান, ২৯ শতাংশ ধর্মহীন ও ৭ শতাংশ মুসলিম
সরকার ব্যবস্থা : ফেডারেল পার্লামেন্টারি ও সাংবিধানিক রাজতন্ত্র
বর্তমান রাজা : ফিলিপ
পার্লামেন্ট : দুই কক্ষবিশিষ্ট
শিক্ষিতের হার : ৯৯ শতাংশ
বেলজিয়াম কোন মহাদেশে অবস্থিত
পশ্চিম ইউরোপের ছোট্ট দেশ বেলজিয়াম। দেশটির উত্তরে নেদারল্যান্ড, পূর্বে জার্মানি, দক্ষিণ-পূর্বে লুক্সেমবুর্গ দক্ষিণ পশ্চিমে ফ্রান্স এবং উত্তর পশ্চিমে আছে উত্তর সাগর। প্রাচীনকাল থেকে দেশটি ছিলো রোমান স¤্রাজ্যের অধীন। এরপর অনেকগুলো যুদ্ধ আর সঙ্ঘাত পেড়িয়ে ১৮৩০ সালে দেশটি নেদারল্যান্ডের কাছ থেকে স্বাধীনতা পায়। ঐতিহাসিক সেই দ্বন্দের রেশ এখনো কাটেনি। যার ফলে ইউরোপের উন্নত আর শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে পরিচিত হলেও দেশটিতে আঞ্চলিক ও ভাষাগত বিরোধ রয়ে গেছে।
বেলজিয়ামের জনসংখ্যা
আয়তনে ছোট হলেও ঘনবসতিপূর্ণ দেশ বেলজিয়াম। দেশটির প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাস করে ৩৭৬ জন লোক। বিশ্বের ঘনবসিতপূর্ণ দেশগুলোর তালিকায় বেলজিয়াম আছে ২২ নম্বরে। দেশটির জনসংখ্যার বড় একটি অংশ অভিবাসী। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বেলজিয়ামের নাগরিকদের মধ্যে প্রায় ১৪ লাখ জন্মসূত্রে ভিনদেশেী। যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৩ শতাংশ। আর বেলজিয়ামে জন্ম কিন্তু পিতামাতা বিদেশী এমন নাগরিকও আছে অনেক।
সব মিলে বিদেশী বংশোদ্ভ’ত নাগরিক ২৮ লাখের বেশি, যা দেশটির মোট জনংখ্যার ২৫ শতাংশ। অভিবাসীদের সবচেয়ে বড় অংশ মরক্কো থেকে আসা। এরপর আছে তুরস্ক, ডিআর কঙ্গো ও ইতালীয়। মুসলিম দেশগুলো থেকে আসা এত সংখ্যক অভিবাসীদের কারণে বেলজিয়ামে পশ্চিম ইউরোপের মধ্যে শতকরা হারে মুসলিমদের সংখ্যা সর্বোচ্চ। জনসংখ্যার প্রায় ৭ শতাংশ মুসলিম।
আর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আছে ডাচ, ফেঞ্চ ও জার্মান ভাষাভাষী লোক। যে কারণে দেশটির অফিশিয়াল ভাষাও এই তিনটি। ভাষাগত এই বৈচিত্রই দেশটিতে বিরোধীতা জিইয়ে রেখেছে। ছোট দেশ হলেও বেলজিয়ামে আছে তিনটি পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল। যে কারণে দেশটির শাসন ব্যবস্থা ধারণ করেছে জটিল রূপ।
উত্তরে আছে ফ্লেমিশ রিজিওন। এটি মূলত ডাচ ভাষাভাষীদের অঞ্চল। দক্ষিণাঞ্চলে আছে ওয়ালোনিয়া, যেখান বসবাস ফরাসি ভাষাভাষীদের। ব্রাসেলস ক্যাপিটাল সিটি নামের তৃতীয় অঞ্চলটি রাজধানীকে ঘিরে- যেটিতে, ডাচ ও ফরাসিদের পাশাপাশি জার্মান ভাষাভাষীদেরও বসবাস।
১৯৬৩ সালের দ্বিতয়ি গিলসন আইন অনুযায়ী এই অঞ্চলগুলো গঠিত হয়েছে। ফ্লেমিশ ও ওয়ালোনিয়া অঞ্চলের মধ্যে আছে পুরনো বিরোধ। আবার ফ্লেমিশে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের একটি আন্দোলনও চলছে।
ভাষাগত এই বিরোধের কারণেই মূলত বেলজিয়ামের শাসন ব্যবস্থা জটিল আকার ধারণ করেছে। দেশটিতে আছে পর্যায়ভিত্তিক কয়েকটি সরকার ব্যবস্থা। ফেডারেল বা কেন্দ্রিয় সরকার, ভাষাভিত্তিক ৩টি আঞ্চলিক সরকার এবং পূর্বাঞ্চলীয় লাইজি প্রদেশে জার্মান ভাষাভাষীদের জন্য আছে আলাদা একটি সরকার। এই প্রতিটি সরকারের জন্য আছে আলাদা পার্লামেন্ট। এছাড়া মূল তিনটি সায়ত্বশাসিত অঞ্চলের অধীনে আছে ১০টি প্রদেশ, প্রদেশগুলোর অধীনে আছে ৪৩টি সাবডিভিশন।
বেলজিয়ামের অর্থনীতি
তবে এতসব জটিলতা সত্ত্বেও উন্নয়ন খুব একটা বাধাগ্রস্ত হয়নি বেলজিয়ামে। পশ্চিম ইউরোপের শিল্পোনত দেশগুলোর পাশাপাশি অবস্থিত হওয়ায় দেশটির অর্থনীতি হয়ে উঠেছে অনেকটাই টেড্রিং বিজনেস নির্ভর। ইউরোপের শিল্প বিপ্লবের পরোক্ষ প্রভাবেই এটি হয়েছে। বেলজিয়ামের শিল্প পরিবহন ব্যবস্থা সমগ্র ইউরোপের সাথে জড়িত। যেটি ট্রেডিং বিজনেসে দেশটিকে করেছে সমৃদ্ধ।
কাচামাল আমদানি করে সেটি ব্যবহার উপযোগী করে আবার রফতানি আছে দেশটির অর্থনীতির বড় অংশ জুড়ে। প্রচুর কাচা হীরে আমমদানি করে বেলজিয়াম। সেগুলো বিভিন্ন নকশা ও ডিজাইনে রুপান্তর করে পাঠানো হয় বিশ্বের বিভন্ন দেশে। একই রকমভাবে অপরিশোধিত রাসায়নিক, লৌহজাত পণ্য আমদানি ও পরবর্তিতে রফতানি করে।
বেলজিয়ামের অর্থনীতির আরেক চালিকা চকলেট। চকলেট উৎপাদন দেশটিতে রীতিমতো বৃহৎ শিল্পের পর্যায়ে চলে গেছে। আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আসে চকলেটের কাচামাল কোকোয়া। সেগুলোর মাধ্যমে তৈরি হয় বাহারি স্বাদ আর ডিজাইনের চকলেট। দেশটিতে ২ হাজারের বেশি চকলেটে কারখানা রয়েছে।
এসব কারখানয় প্রতি বছর উৎপাদিত হয় ১ লাখ ৭২ হাজার টন চকলেট, যা রফতানি হয় সারা বিশ্বে। এ কারণে বেলজিয়ামকে চকলেটের দেশও বলা হয়। কোট ডি’অর দেশটির সবচেয়ে বিখ্যাত চকলেট কোম্পানি।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য বেলজিয়ামের অর্থনীতি পুরোপুরি মুক্তবাজার পদ্ধতিতে চলে।
বেলজিয়ামের বাজারে আছে প্রচুর বিদেশী প্রতিষ্ঠান। অর্থনীতির বড় একটি অংশ সেবাখাত নির্ভর। আর অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু রাজধানী ব্রাসেলস।
বেলজিয়ামের রাজধানী কোথায়
দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের তুলনায় রাজধানী ব্রাসেলসের মানুষেরা সম্পদশালী। তবে নগরীটির খুবই ঘনবসতিপূর্ণ। মাত্র ৩২ বর্গকিলোমিটারের ব্রাসেলসে বসবাস করে এক লাখ ৭৬ হাজার মানুষ। তবে নাগরিকদের উপচে পড়া ভীড় থাকলেও ব্রাসেলস তার সৌন্দর্য হারায়নি।
বরং ইউরোপের আরো অনেক নগরীরর চেয়ে হয়ে উঠেছে অনেক দিন থেকেই দৃষ্টিনন্দন। রাতের ব্রাসেলস সবেেচয় সুন্দর। কথিত আছে ব্রাসেলসের সড়কগুলো রাতে এতটাই উজ্জল থাকে যে, মহাকাশ থেকেও ইউরোপের অন্য নগরীগুলোর সাথে তার পার্থক্য প্রতীয়মান হয়।
বেলজিয়াম দেশটি কেমন
ছোট্ট ব্রাসেলসে দর্শনীয় স্থানের অভাব নেই। দর্শণার্থীদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় শহরে কেন্দ্রস্থলের গ্রান্ড প্লেস। জায়গাটিকে কেউ বলেন ব্রাসেলসের জিরো পয়েন্ট। চারদিকে প্রাচীন আমলের ঐশ্বর্যমন্ডিত কয়েকটি ভবনের মাঝখানে খোলা চত্বর। ভবনগুলো মধ্যে আছে পঞ্চদশ শতকে নির্মিত টাউন হল, কাছাকাছি সময়ে নির্মিত কিংস হাউস এবং পাশাপাশি চারটি প্রাসাদ। আধুনিক বিশ্বের বড় নগরীগুলো যখন অত্যাধুনিকসব টাউন হল নির্মাণ করছে, ব্রাসেলস তখনো ধরে রেখে পুরোনো ঐতিহ্য। টাউন হলে আছে ১৩৭ জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ভাস্কর্য।
এখানকার প্রতিটি ভবনের নির্মাণশৈলী অত্যন্ত আকর্ষণীয়। গ্রান্ড প্লেসের চত্বরে প্রতি দুই বছর পর পর বিশাল একটি তাজার ফুলের কার্পেট বানানো হয়। বিভিন্ন রংয়ের ফুল ব্যবহার করে তৈরি কার্পেটি একেকবার একেকটি প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে তৈরি। কয়েকশ লোক নিরলস পরিশ্রম করে কার্পেটটি তৈরি করে।
গ্রান্ড প্লেস থেকে পায়ে হাটা পথে ৫ মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত মানেকেন পি’স নামের একটি ভাস্কর্য। ১৬১৯ সালে স্থাপিত ব্রোঞ্চের তৈরি একটি শিশুর ভাস্কর্যটি মূলত একটি ঝর্না। যেখানে শিশুটিকে দেখা যায় মূত্রত্যাগ করতে। বেলজিয়ামের খুব জনপ্রিয় একটি প্রতীক এই শিশুটি। এই ডিজাইনের পুতুল, চকোলেট, গিফট সামগ্রী প্রচুর বিক্রি হয় দেশটিতে।
বেলজিয়ামের দর্শণীয় স্থান
প্রাচীন স্থাপত্যের আরেক নিদর্শন ব্রাসেলস ক্যাথেড্রাল। ১১ শতকে স্থাপিত একই ক্যাথলিক চার্চটি পুরোটাই পাথরের তৈরি। এছাড়া ফ্লেমিশ রিজিওনের ব্রুগেসকে বলা হয় বেলজিয়ামের ভেনিস। খালগুলোই এই অঞ্চলে যোগাযোগের প্রধানমাধ্যম হিসেব ব্যবহৃত হয়। দর্শনার্থীদের কাছে খুবই জনপ্রিয় এলাকাটি। এছাড়া ফ্লান্ডার্সে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধক্ষেত্র কিংবা ঐতিহাসিক নগরী গেন্ট পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় স্থান। ইতিহাসের প্রতি আগ্রহ থাকলে ওয়াটারলু যুদ্ধক্ষেত্র দেখার লোভ সামলাতে পারবেন না আপনি। এই ময়দানেই ফরাসি যোদ্ধা নেপোলিয়ান বোনপার্ট তার জীবনের শেষ যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিলেন সেভেনথ কোয়ালিশন ফোর্সের কাছে। সেই জায়গাটিতে দর্শণীয় করে তুলতে বেলজিয়াম কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত মনেরম করে তুলেছেন।
ছোট্ট নগরী ব্রাসেলস বিশ্ব রাজনীতিতেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। ব্রাসসেলকে বলা হয় ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাজধানী। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ অফিস ব্রাসেলসে যেমন, ইউরোপীয়ান পার্লামেন্ট, ইউরোপিয়ান কমিশন, ইউরোপীয়ান কাউন্সিল। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ইউরোপ ও আমেরিকার সামরিক জোট ন্যাটোর হেড অফিসও ব্রাসেলসে অবস্থিত।
ছোট্ট দেশটির গর্ব করার মতো অনেক কিছু আছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে তিন বার এবং পদার্থ ও রসায়নে একবার করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন বেলজিয়ামের বিজ্ঞানীরা। এছাড়া এখন পর্যন্ত গণিতে ফিল্ড মেডেল পেয়েছেন দুই বেলজিয়ান। বেলজিয়ামের বর্তমান রাজা ফিলিপ। যিনি ২০১৩ সালে সিংহাসনে বসেছেন পিতার পদত্যাগের পর। স্বাধীনতার পর থেকে এই পরিবারটিই উত্তরাধিকার সূত্রে দেশটি শাসন করে চলছে। পাশাপাশি রয়েছে একটি ফেডারেল সরকার, যেটি চলে একজন প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে।
০৯-০৬-২০২০
আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন : আহমেদ স্টোর


