খাবিব নুরমাগোমেদভ, অনেকে অবশ্য বলেন হাবিব নুর মোহাম্মাদ- মিক্সড মার্শাল আর্ট জগতের এক জীবন্ত কিংবদন্তী। এই খেলায় তিনি যা করেছেন সেটিকে শুধু বিস্ময়কর বললেও কম বলা হবে। বিশ্বে খুব কম ক্রীড়া তারকাই রয়েছে যারা পেশাদার ক্যারিয়ারে কখনোই পরাজয়ের স্বাদ পাননি। খাবিব নুরমাগোমেদভ সেই অল্প সংখ্যক ক্রীড়া তারকাদের একজন। জানাবো রাশিয়ার এই মুসলিম ক্রীড়া তারকার সম্পর্কে-
মিক্সড মার্শাল আর্ট খেলাটি আমাদের এই অঞ্চলে একেবারেই অপ্রচলিত হওয়ায় এই মহাতারকা আমাদের অনেকের কাছেই অচেনা। যতদিন খেলেছেন, যতবার রিংয়ে নেমেছেন প্রতিবারই বিজয়ীর বেশে রিং ছেড়েছেন। তার সমসাময়িক অ্যাথলেটদের কাছে খাবিব নুরমাগোমেদভ মানেই যেন অমীমাংসীত এক ধাধা, যার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামা মানেই পরাজয়। রাফায়েল ডস অঞ্জনস, মিচেল জনসন, কনর ম্যাকগ্রেগরের মতো বড় বড় তারকাদের হারিয়েছেন দাপটের সাথে।
মার্কিন সংবাদ মাধ্যম ফক্স নিউজ যাকে এই গ্রহের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অ্যাথলেট হিসেবে আখ্যায়িত করেছে সেই খাবিব কিন্তু মার্শাল আর্টের মতো খেলায় আসতে চাননি। তার শৈশবের স্বপ্ন ছিলো ফুটবলার হওয়া। নিজেই বলেছেন, ছোটবেলায় সারাদিন ফুটবল নিয়ে ভাবতাম। ফুটবলার হবো এমন স্বপ্ন দেখতাম।
খাবিব নুরমাগোমেদ : জন্ম ও বেড়ে ওঠা
তবে খাবিবের জন্ম রাশিয়ার সায়ত্বশাসিত দাগেস্তান এলাকায়। ককেশাস পার্বত্য অঞ্চলে কাস্পিয়ান সাগরের উপকূলের এই এলাকাটিতে অনেগুলো উপজাতীয় গোষ্ঠির বসবাস। খাবিব নিজেই বলেছেন, তার যেখানে জন্ম সেখানে ফুটবলার হওয়ার মতো পরিবেশ ছিলো না। তবে অঞ্চলটিতে মার্শাল আর্টের চর্চা রয়েছে খুব। তার ভাষায় ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এখানে জন্ম নিলে ফুটবলের নয়, মার্শাল আর্টের শিরোপা জিততেন।
ফ্রান্সে বাকস্বাধীনতার নামে ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষী প্রচারণার বিরুদ্ধেও অবস্থান নেন দ্য ঈগল। দাগেস্তানে নাইটক্লাব ও বার বন্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।
১৯৮৮ সালের ২০ সেপ্টেম্বর দাগেস্তানের সিলদি নামের এক পাহাড়ি গ্রামে জন্ম খাবিবের। আর দশটা পাহাড়ি বালকের মতো ছোটবেলা থেকেই পাহাড়ের গা বেয়ে ওঠা, ঢাল বেয়ে নামা কিংবা দুর্গম পথে চলতে অভ্যস্ত ছিলেন। এই অভ্যাসটাই খাবিবকে শক্ত ও দৃঢ় মানসিকতা এনে দিয়েছে, যার কারণে ম্যাচ খেলতে নামলেই সাফল্যের ক্ষুধা তাকে তাড়িয়ে বেড়াতো।
বাবার কাছ থেকেই এই খেলাটার প্রতি ঝোঁকটা পেয়েছিলেন খাবিব। বাসায় একটি জিম ছিলো, সেখানে স্থানীয় ছেলেরা আসতো। পাশাপাশি মার্শাল আর্টও শেখাতেন খাবিবের বাবা আবদুল মানাপ নুরমাগোমেদভ, যিনি এক সময় সোভিয়েত সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন। সেনাবাহিনীর চাকরিতে থাকতেই জুডো ও স্যামবো মার্শাল আর্ট শেখা খাবিবের বাবার। অবসরের পর তাই কাজ শুরু করেন কোচ হিসেবে।
খাবিব বক্সার হয়ে ওঠা
৯ বছর বয়সে বাবার কাছে স্থানীয় ছেলেদের মার্শাল আর্ট শেখা দেখেই খাবিব এই খেলাটার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। যদিও তার ধ্যান জ্ঞান ছিলো ফুটবল; কিন্তু এমন একটি পাহাড়ি এলাকায় তার বেড়ে ওঠা যেখানে ফুটবলার হওয়ার জন্য খুব বেশি সুযোগ ছিলো না, তার ওপর বাবা যখন মার্শাল আর্টের কোচ।
খাবিবের বাবা আবদুল মানাপ রাশিয়ার প্রথম সাড়ির একজন কোচ ছিলেন। কোচিং ক্যারিয়ারে তার ১৮ জন শীষ্য বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। তার ভাই অর্থাৎ খাবিবের এক চাচাও ছিলেন স্যামবো মার্শাল আর্টের দুর্দান্ত খেলোয়াড়। আবদুল মানাপের কোচিংয়েই তিনি ১৯৯২ সালে ইউক্রেন জাতীয় দলের হয়ে ওয়ার্ল্ড স্যামবো মার্শাল আর্ট চ্যাম্পিয়নশীপের শিরোপা জিতেছিলেন।
ফাইট ম্যাট্রিক্সের র্যাঙ্কিংয়ে লাইটওয়েট ক্যাটাগরিতে সর্বকালের সেরা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে তাকে
ইসমাইল মাখাচেভ, সুলতান আলিয়েভ, রুস্তম খাবিলভসহ দাগেস্তানের ছয় জন অ্যাথলেট ওয়ার্ল্ড স্যামবো চ্যাম্পিয়নশীপের শিরোপা জিতেছেন আবদুল মানাপের কোচিংয়ে। ওমর ও উসমান নামে খাবিবের দুই চাচাতো ভাইও বর্তমানে পেশাদার মার্শাল আর্টের খেলোয়াড় হিসেবে খেলছেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে।
কাজেই পরিবারে মার্শাল আর্টের এই চর্চাই খাবিবকে এই খেলায় এনেছে। আর যার ঘরেই ছিলেন আবদুল মানাপের মতো খ্যাতিমান কোচ, তার হাতে সাফল্য তো ধরা দিবেই। ক্যারিয়ারের শেষ পর্যন্ত বাবার কোচিংয়েই খেলে গেছেন খাবিব। ২০২০ সালে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত বাবা আবদুল মানাপই ছিলেন খাবিবের কোচ ও ট্রেনার।

মফস্বলে মার্শাল আর্ট চর্চা শুরু হলেও ২০০১ সালে খাবিবের পরিবার দাগেস্তান প্রদেশের রাজধানী মাখাচকালায় স্থীয়ভাবে বসবাস শুরু করে। খাবিবের বয়স তখন ১২। সে সময় রেসলিং এবং ১৫ বছর বয়স থেকে শুরু হয় তার জুডো চর্চা। এর ২ বছর পর শুরু করেন রাশিয়ান স্যামবো মার্শাল আর্ট শেখা। কিশোর খাবিবের জন্য এক সাথে এতকিছু করা কঠিন ছিলো, তবে বাবার আগ্রহের কারণেই তিনি কখনো পিছপা হননি।
বাবাই ছিলেন যার কোচ
কিছুদিন পর খাবিবের বাবা আবদুল মানাপ দাগেস্তান রিপাবলিকের স্যামবো টিমের প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব নিলে খাবিব সেই টিমে খেলার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। মূলত বাবাই খাবিবের মধ্যে ফাইটিংয়ের অনেকগুলো ধারার সন্নিবেশ ঘটিয়েছিলেন। এতে কিশোর বয়সে তার ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়লেও সেটি তাকে শক্ত সামর্থ, দক্ষ আর সাহসী ফাইটার হিসেবে তৈরি করেছে। যে কারণে পেশাদার জগতে প্রবেশের পর রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছেন।
২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে পেশাদার জগতে অভিষেক তার। অনেকগুলো শাখায় অভিজ্ঞ হলেও মিক্সড মার্শাল আর্টেই পেশাদার ক্যারিয়ার গড়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। অভিষেকের এক মাসের মধ্যেই চারটি ফাইট জিতে হৈচৈ ফেলে দেন অ্যাথলেটিক জগতে। পরের মাসে মস্কোয় অনুষ্ঠিত আটরিয়াম কাপের প্রথম আসরের শিরোপা জিতে নেন প্রচণ্ড দাপটের সাথে।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের আঞ্চলিক পর্যায়ে টানা ১৬টি লড়াই জেতার পর আমেরিকার মিক্সড মার্শাল আর্ট প্রোমোশন কোম্পানি ইউএফসি তার সাথে চুক্তি করে। এই প্রতিষ্ঠানটির সাথে চুক্তির পরই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি পান খাবিব। এরপর জিতেছেন একের পর এক ফাইট ও শিরোপা।
খাবিবের হঠাৎ অবসর
পরপর তিনটি শিরোপা জিতে ইউএফসির ইতিহাসে টানা ৯৩১ দিন লাইটওয়েট চ্যম্পিয়নশীপের শিরোপা ছিলো তার দখলে। প্রথম কোন মুসলিম হিসেবে তার হাতেই উঠেছে এই শিরোপা। পাশাপাশি স্যামবো মার্শাল আর্টেও দুইবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। সব মিলে পেশাদার ক্যারিয়ারে ২৯টি ম্যাচ খেলে কখনো হারেননি দ্যা ঈগল খ্যাত এই কিংবদন্তী। ৮ বার প্রতিপক্ষকে করেছেন নকআউট। ২০১৬ সালে নির্বাচিত হয়েছেন ইন্টারন্যাশনাল ফাইটার অব দ্য ইয়ার। ২০২০ সালে বিবিসির ওয়ার্ল্ড স্পোর্টস স্টার মনোনীত হয়েছেন খাবিব। ফাইট ম্যাট্রিক্সের র্যাঙ্কিংয়ে লাইটওয়েট ক্যাটাগরিতে সর্বকালের সেরা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে তাকে।
আরো পড়ুন :
এবি ডি ভিলিয়ার্স : মিস্টার ৩৬০ ডিগ্রি
মানুষের পাশে রোনালদো, মানবিক রোনালদো
তবে ২০২০ সালের ২৪ অক্টোবর সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে ইউএফসি বা আলটিমেট ফাইটিং চ্যাম্পিয়নশীপের ম্যাচ খেলে আচমকাই অবসরের ঘোষণা দেন। সেই ম্যাচে খাবিব মাত্র ১ মিনিট ৩৪ সেকেন্ডে যুক্তরাষ্ট্রের জাস্টিন গেটজেকে হারিয়ে শেষ করেন বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার। তার বয়স তখন ৩২ বছর।
চাইলে আরো কয়েক বছর চালিয়ে যেতে পারতেন খেলা। সারা বিশ্বের ভক্ত সমর্থক ও মার্শাল আর্ট সংশ্লিষ্ট সবাই অবাক হয় এমন সিদ্ধান্তে। তবে খাবিব জানান করোনা ভাইরাসে বাবাকে হারানোর পর আর মাঠে নামতে ইচ্ছে করেনি তার। বাবাই ছিলেন তার কোচ, ট্রেনার, মেন্টর। যে বাবার ইচ্ছেয় খাবিব মার্শাল আর্টে এসেছেন, তাকে ছাড়া আর মাঠে নামতে চান না তিনি।
খাবিব বলেন, গেটজের বিরুদ্ধে এই ম্যাচের আমন্ত্রণ পাওয়ার পর আমি মায়ের সাথে টানা তিনদিন পরামর্শ করেছি ক্যারিয়ার নিয়ে। মাও চান না আমি বাবাকে ছাড়া রিংয়ে নামি। শেষে সিদ্ধান্ত নিয়েছি এটিই হবে আমার শেষ ফাইট। কান্নাজড়িত কণ্ঠে শেষ জয়টি বাবাকে উৎসর্গ করে খাবিব বিদায় জানান তার সাফল্যভরা ক্যারিয়ারকে।
মুসলিম বক্সার খাবিব
সাফল্যের চূড়ায় উঠলে কখনোই নীতি আদর্শ বা নিজস্ব সংস্কৃতি বিসর্জন দেননি খাবিব। রুশ ও দাগেস্তানী হিসেবে গর্বভরে নিজের পরিচয় দেন সব সময়। স্থানীয় আভার তার মাতৃভাষা হলেও রুশ, ইংলিশ, টার্কিশ ও আরবি ভাষায় দক্ষতা রয়েছে তার। ২০২০ সালের অক্টোবরে ব্রিটিশং সংবাদ মাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের জরিপে মিসরীয় ফুটবলার মোহাম্মাদ সালাহর পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জনপ্রিয় মুসলিম ক্রীড়াবিদ নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
২০২০ সালের অক্টোবরে ইসলাম বিদ্বেষী মন্তব্যের জন্য ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোর কড়া সমালোচনা করেন খাবিব। সে সময় ফ্রান্সে বাকস্বাধীনতার নামে ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষী প্রচারণার বিরুদ্ধেও অবস্থান নেন দ্য ঈগল। দাগেস্তানে নাইটক্লাব ও বার বন্ধের সিদ্ধান্তেও তিনি স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।

একবার শিরোপা জয় নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, আমি অনেককেই চিনি যারা মার্শাল আর্টকে অর্থ উপাজনের কাজে লাগাচ্ছে, কিন্তু অর্থই আমার কাছে সব নয়। মার্শাল আর্টই আমার জীবন, এটি আমার রক্ত। আরো অনেকভাবে অর্থ উপাজর্ন করা যায়; কিন্তু আমি শিরোপা জিততে চাই।
২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসে অনুষ্ঠিত কনর ম্যাকগ্রেগরের বিরুদ্ধে তার লড়াইটি ছিলো ব্যাপক আলোচিত। কারণ ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে আইরিশ ফাইটার ম্যাকগ্রেগর খাবিবের মুসলিম পরিচয় নিয়ে আক্রমণাত্মক কথা বলেছিলেন এবং তার টিম বাসেও চেয়ার ছুড়ে মেরেছিলেন। যার ফলে খেলা চলাকালীন খাবিব এতটা রেগে ছিলেন যে, ম্যাকগ্রেগরকে ঘুষি মারতে মারতে বলেন, তুমি কী বলতে চাও এবার বলো’।
তাতেও জিদ না কমায় ম্যাচ শেষে রিং ডিঙিয়ে ম্যাকগ্রেগরের টিম মেম্বারদের আক্রমণ করেন। এই ঘটনায় অবশ্য খাবিব ও ম্যাকগ্রেগর এবং দুজনের টিমের বেশ কিছু সদস্য সাময়িক নিষেধাজ্ঞা পেয়েছিলেন।
ব্যক্তিগত জীবনে তিন সন্তানের জনক এই অ্যাথলেট শৈশবের ফুটবল প্রেমটাকে এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন। স্থানীয় ক্লাব আনঝি মাখাচকালা কিংবা লিভারপুল এফসি, রিয়াল মাদ্রিদ, গ্যালাতাসারের খেলা হলে বসে থাকেন টিভির সামনে।


