আফ্রিকার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে এসে ইউরোপের ফুটবলে দাপটের সাথে বিচরণ করছেন ফুটবলার সাদিও মানে। পাঁচ বছরের মধ্যে লিভারপুল ক্লাবকে এনে দিয়েছেন লিগ শিরোপা, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা, ক্লাব বিশ্বকাপসহ অনেক কিছু। নিজেকে নিয়ে গেছেন সেরা ফুটবলারদের কাতারে। তবে তারকাখ্যাতি তাকে বিচ্যুত করতে পারেনি মানুষের প্রতি ভালোবাসা থেকে। বিলাসিতা না করে উপার্জিত অর্থ খরচ করেন মানুষের জন্য।
সেনেগালের এক নিভৃত পল্লীর একটি মসজিদের ইমামের ছেলে কিভাবে বিশ্ব ফুটবলে তারকা খ্যাতি অর্জন করেছেন সেই গল্প উঠে এসেছে এই লেখায়…..
২০০২ সালের কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো খেলার সুযোগ পায় সেনেগাল। প্রথম সুযোগেই একের পর এক বিস্ময় উপহার দিতে থাকে নবাগত দলটি। উদ্বোধনী ম্যাচেই আগের বারের চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে হারিয়ে দেয় তারা। এরপর একের পর এক অবিশ্বাস্য ম্যাচ উপহার দিয়ে দেশটি ওঠে কোয়ার্টার ফাইনালে।
পুরো সেনেগাল মেতে ওঠে আনন্দে। জাতীয় ফুটবলারদের সেই সাফল্য স্বপ্ন বুনে দেয় ১০ বছরের এক কিশোরের মনে। ফুটবলার হওয়া আর দেশের হয়ে বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন দেখে বেড়ে উঠতে থাকে ছেলেটি। ঠিক ১৬ বছর পর ২০১৮ সালে আবার যখন সেনেগাল বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেল, তখন সেই ছেলেটিই দলের প্রাণভোমরা। তার পায়ের জাদুতেই আবার বিশ্বকাপ স্বপ্ন পুরণ হয় সেনেগালবাসীর।
অভাবের সংসারে নেমে আসে অমানিশার অন্ধকার। কিন্তু ফুটবলার হতেই হবে- এই ছিল জিদ।
সাদিও মানে কোন দেশের খেলোয়াড়
নাম তার সাদিও মানে। পশ্চিম আফ্রিকার দেশ সেনেগালের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকার বাম্বালি নামের এক গ্রামের ছেলে সাদিও মানে। জন্ম ১৯৯২ সালের ১০ এপ্রিল। বাবা ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম। তার স্বল্প আয়ে অনেকগুলো সন্তানের ভরণপোষণ কষ্টকর ছিল। ছোটবেলা থেকেই মানের ছিল ফুটবলের নেশা। দরিদ্র পরিবারের কাছে সন্তানদের ফুটবলার হওয়ার আশা বিলাসিতা। তারা চাইতো সন্তান লেখাপড়া করে ভালো চাকরি করবে; কিন্তু সেসবে মন বসতো না মানের।
পরিবারের সাথে কখনো ফসলের ক্ষেতে কাজ করতেও চাইতো না সে। পড়ালেখা বাদ দিয়ে ফুটবল নিয়েই মেতে থাকতো। কাগজের দলা বা কাপড়ের পুটলি বানিয়ে খেলতো সারাদিন। বিকেলে সবার আগে মাঠে পাওয়া যেত তাকে। দিনের অন্য সময়গুলোতেও চেষ্টা করতো সঙ্গী জুটিয়ে ফুটবল খেলার।
সাদিও মানের জীবনী
সাদিও মানের বয়স যখন ১১ বছর, তখন তার বাবা মারা যায়। অভাবের সংসারে নেমে আসে অমানিশার অন্ধকার। তখন মানেকে নিয়ে যান তার এক চাচা। চাচার বাসায় থেকেও তার ফুটবলের নেশা এতটুকু কাটেনি। ফুটবলার হতেই হবে- এই এক জিদ। এর মধ্যে পাড়ায় দারুণ খেলতে দেখে অনেকেই পরামর্শ দেন তাকে কোন ফুটবল একাডেমিতে ভর্তি করিয়ে দিতে।

উস্কানি পেয়ে একাই পালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন রাজধানী ডাকারে; কিন্তু ধরা পড়ার পর পরিবার শর্ত দেয় স্কুলে আরো এক বছর পড়াশোনা শেষ করে যেতে হবে। বাধ্য হয়ে রাজি হয় মানে। এক পর্যায়ে চাচা সিদ্ধান্ত নেন মানেকে সেনেগালের রাজধানী ডাকারে পাঠানোর। চাচার হাত ধরে পরিবারের ফসল বিক্রির কিছু টাকা আর স্থানীয় কয়েকজনের সহযোগিতায় তার রাজধানীতে যাওয়ার বন্দোবস্ত হয়। বয়স তখন ১৫ বছরের কিছু বেশি।
২০০৯ সালে একটি টুর্নামেন্টে খেলা দেখে তাকে ট্রায়ালে ডাকে ‘জেনারেশন ফুট’ নামের একটি ফুটবল অ্যাকাডেমি। ট্রায়ালের পর কর্মকর্তারা তার প্রতিভায় এতটাই মুগ্ধ হন যে, সেদিনই তাকে ভর্তি করে নেন। শুরু হয় প্রাতিষ্ঠানিক ফুটবল শেখা। সে সময় জেনারেশন ফুট অ্যাকাডেমির সাথে চুক্তি ছিল ফ্রান্সের ঘরোয়া লিগের দ্বিতীয় স্তরে খেলা এফসি মেৎজ ক্লাবের। চুক্তি অনুযায়ী অ্যাকাডেমির প্রতিভাবান তরুণদের ডাকা হতো ফ্রান্সের ক্লাবটিতে। তেমনই এক সুযোগে ১৮ বছর বয়সী সাদিও মানে পা রাখেন ফ্রান্সে। সময়টি ছিলো ২০১১-১২ মৌসুম।
প্রথম মৌসুমে খুব একটা খেলতে পারেননি ইনজুরি আর ইউরোপের প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় মানিয়ে নিতে না পারার কারণে। তবুও অল্প কয়েকটি ম্যাচ দেখেই মানেকে পছন্দ করে ফেলে অস্ট্রিয়ার শীর্ষ লিগের ক্লাব রেড বুল সালজবুর্গ। যার ফলে পরের মৌসুমের শুরুতেই ৪০ লাখ ইউরো ট্রান্সফার ফি’তে তাকে কিনে নেয় ক্লাবটি। প্রথম মৌসুমেই ক্লাবটিকে এনে দেন দুটি শিরোপা। তিন ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেন সাদিও মানে। তবে ক্লাবটির কর্মকর্তাদের সাথে বনিবনা না হওয়ায় দুই মৌসুমের বেশি খেলা হয়নি অস্ট্রিয়ায়। এটি অবশ্য শাপে বরই হয়ে দেখা দিয়েছে তার ক্যারিয়ারের জন্য।
ইংলিশ ফুটবলে যাত্রা শুরু
২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব সাউদাম্পটন এফসি ১ কোটি ১৮ লাখ ইউরো ট্রান্সফার ফিতে তাকে কিনে নেয়। ক্লাবটির সাথে চুক্তি হয় চার বছরের। ইংলিশ ফুটবলে শুরু হয় তার পথচলা। প্রথম মৌসুমেই ক্লাবটির হয়ে গড়েন দ্রুততম হ্যাটট্রিকের রেকর্ড। অ্যাস্টন ভিলার বিপক্ষে হোম ম্যাচে তিনটি গোল করেন দুই মিনিট ৫৬ সেকেন্ডের মধ্যে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে এটি দ্রুততম হ্যাটট্রিক। ৩২ ম্যাচে ১০ গোল করে দারুণ এক মৌসুম শেষ করেন। পরের মৌসুমেও এই পারফরম্যান্স ধরে রাখেন। সেবার ১৫ গোল করে ক্লাবের সেরা গোলদাতাও হন।

কিন্তু একটু বড় ক্লাবে খেলতে কার না ইচ্ছে হয়। তাই লিভারপুল এফসির প্রস্তাব পেয়েই রাজি হয়ে যান।
লিভারপুলে সাদিও মানে
২০১৬-১৭ মৌসুমে ৩ কোটি ৪০ লাখ ইউরো ট্রান্সফার ফিতে যোগ দেন লিভারপুলে। ক্লাবটির সাথে চুক্তি হয় ৫ বছরের। জুটি বাধেঁন ক্লাবের মিসরীয় ফরোয়ার্ড মোহাম্মাদ সালাহ’র সাথে। এরপর নিজের চলার পথকে শুধুই রাঙিয়ে চলেছেন এই ফরোয়ার্ড। ক্লাবকে এনে দিয়েছেন একের পর এক সাফল্য।
নিজের মুকুটেও যুক্ত করেছেন নতুন নতুন পালক। প্রথম মৌসুমেই মনোনীত হয়েছেন লিভারপুলের সেরা খেলোয়াড়। গতি, ফিনিশিং দক্ষতা, ড্রিবলিং- সবকিছুতেই হার মানিয়েছেন প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের।
এই প্রতিবেদনের ভিডিও দেখুন
সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের সেরা ফুটবল ক্লাবগুলোর একটি ইংল্যান্ডের লিভারপুল এফসি। ২০১৮-১৯ মৌসুমে ক্লাবটি জিতেছে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা। আগের বছর অর্থাৎ ২০১৭-১৮ মৌসুমেও তারা খেলেছিল চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল। এছাড়া ২০১৯ সালের ক্লাব বিশ্বকাপ, উয়েফা সুপার কাপ জিতেছে জার্গেন ক্লপের শীষ্যরা। আর ২০১৯-২০ মৌসুমে দীর্ঘ ৩০ বছর পর রেকর্ড ব্যবধানে জিতেছে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা। অর্থাৎ কয়েক বছরে ক্লাব ফুটবলের সবগুলো বড় শিরোপা ঘরে তুলেছে ক্লাবটি। ২০২১-২২ মৌসুমেও দলটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগে রানার্স আপ হয়েছে।
লিভারপুলের হয়ে চার মৌসুমে সাদিও মানের গোল ছিলো যথাক্রমে ১৩, ১০, ২২ ও ১৮টি। তবে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার কারণে ২০২০-২১ মৌসুমের বেশিরভাগ সময় মাঠের বাইরেই থাকতে হয়েছে এই ফরোয়ার্ডকে।
জাতীয় দলের হয়েও সাদিও মানে দারুণ পারফর্ম করেছেন। ১৬ বছর পর ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্ব কাপের মূলপর্বে তুলেছেন সেনেগালকে। ২০১৯ সালের আফ্রিকান নেশনস কাপের ফাইনালে তুলেছেন দেশকে। নিজে পেয়েছেন ওই বছর আফ্রিকার বর্ষসেরা ফুটবলারের পদক।
আরো পড়ুন :
দ্য ঈগল : মার্শাল আর্ট কিংবদন্তী খাবিব নুরমেগোমেদভ
২০২২ সালের মাঝামাঝিতে বুন্দেস লিগার ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখে যোগ দেন মানে। ট্রান্সফার ফি ছিলো ৩২ মিলিয়ন ইউরো। ক্লাবটির সাথে চুক্তি হয়েছে ২০২৫ সাল পর্যন্ত।
সাদিও মানে ধর্ম
তারকা দ্যুতিতে ঝলমলে ফুটবল ক্যারিয়ারের অধিকারী সাদিও মানের ব্যক্তিজীবনের গল্পটা ঠিক উল্টো। বিশ্ব মঞ্চে আলো ছড়ালেও নিজের শেকড়কে ভুলে যাননি তিনি। ইমাম বাবার সংসারে যে নৈতিকতা আর মানবিক মূল্যবোধ শৈশবে তার হৃদয়ে জায়গা পেয়েছে সেটিও ধরে রেখেছেন। ধার্মিক মানেকে এখনো প্রায়ই দেখা যায় মাঠেই দুহাত তুলে মোনাজাত করতে। গোল উদযাপন করেন সিজদা দিয়ে।
নিজের গ্রামের সেই মসজিদে তার দেয়া অর্থেই নির্মিত হয়েছে চমকৎকার একটি ভবন। গ্রামের মানুষদের জন্য স্কুল ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছেন। কিছুদিন আগে নিজের টাকায় গ্রামের ছেলেদের জন্য পাঠিয়েছে লিভারপুল ক্লাবের তিনশটি জার্সি। বাম্বালি গ্রামের সব কিশোর এখন সাদিও মানে হতে চায়। শুধু গ্রাম নয় পুরো সেনেগাইল এখন গর্ব করে সাদিও মানেকে নিয়ে।

ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত নম্র আর বিনীয় একজন মানুষ এই ফুটবলার। লিভারপুল ক্লাবে প্রতি সপ্তাহে তার বেতন ছিল ১ লাখ ব্রিটিশ পাউন্ড। বাংলাদেশী টাকায় যা এক কোটি ২০ লাখ, অর্থাৎ প্রতি মাসে ৫ কোটি টাকা; কিন্তু এত উপার্জন করেও খুবই সাদামাটা জীবন যাপন করেন এই ফুটবলার।
ভাঙা আইফোনের কথা
২০১৯ সালের শেষ দিকে ব্রিটিশ মিডিয়ায় একটি ছবি ভাইরাল হয়। সেখানে দেখা গেছে সাদিও মানের হাতের আইফোনটির স্ক্রিন খুব বাজে ভাবে ভাঙা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনার পর সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে মানে বলেন, ‘২০টি ফেরারি গাড়ি, ২০টি হীরে বসানো ঘড়ি কিংবা দুটি প্লেন চাইলেই আমি কিনতে পারি; কিন্তু এতে আমার কী লাভ হবে, বিশ্বেরই বা কী উপকার হবে?’
তিনি বলেন, আমি আমার উপার্জনের টাকায় স্কুল আর স্টেডিয়াম বানাচ্ছি। গরিবদের জন্য খাবার ও কাপড় দিচ্ছি। সেনেগালের খুবই দরিদ্র একটি গ্রামের প্রতিটি পরিবারকে মাসে ৭০ ইউরো করে দিচ্ছি।
এগুলো মানুষের উপকারে আসছে। চাইলেই বিলাসি গাড়ি, বিলাসি বাড়ি বানাতে পারতাম; কিন্তু তার বদলে জীবন আমাকে যা দিয়েছে তা থেকে মানুষকে সহযোগিতা করতেই আমার আনন্দ।
আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন : আহমেদ স্টোর


